ঢাকা | অক্টোবর ৬, ২০২৬ - ১২:৩০ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

একসময়ের বিশ্বজয়ী রাজশাহীর বাতাসে এখন বিষ

  • আপডেট: Monday, October 5, 2026 - 10:52 pm

চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নগরবাসী:

স্টাফ রিপোর্টার: যে রাজশাহী একসময় বাতাসে ভাসমান ক্ষতিকর ধূলিকণা কমিয়ে বায়ুদূষণ রোধে বিশ্বে শীর্ষ স্থান দখল করেছিল, সেই পরিবেশবান্ধব পদ্মাপাড়ের নগরীর বাতাসে এখন জমেছে মারাত্মক দূষণের বিষ।

আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ার-এর রিয়েল-টাইম তথ্য অনুযায়ী, নগরীর বায়ুমান সূচক বিপজ্জনক ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে বাতাসে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা পিএম২.৫-এর মাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশু, বয়স্ক ও রোগীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী বায়ুমান সূচক ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত থাকলে তা সাধারণ মানুষের জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে ছোট অতিক্ষুদ্র এসব কণা মানুষের মাথার চুলের ব্যাসের প্রায় ৩০ ভাগের এক ভাগ।

এগুলো এতোটাই সূক্ষ্ম যে শ্বাসের সঙ্গে সরাসরি ফুসফুসের গভীরে এবং রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘসময় এমন পরিবেশে অবস্থান করলে সুস্থ মানুষেরও শ্বাসতন্ত্র ও হৃদযন্ত্রের জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় বায়ুদূষণের সঙ্গে শারীরিক ব্যাধির পাশাপাশি বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপের গভীর সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। এমনকি ২০২৬ সালে প্রকাশিত রাজশাহী ও ঢাকার বায়ুদূষণ সংক্রান্ত এক গবেষণাতেও বাতাসে পিএম২.৫ বৃদ্ধির সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের অবনতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ মিলেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় পিএম২.৫-এর গড় সহনীয় মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রাম হলেও বর্তমানে রাজশাহীর বাতাসে এই মাত্রা অনেক বেশি। এ অবস্থায় অপ্রয়োজনে দীর্ঘসময় বাইরে না থাকা এবং বের হলে ভালো মানের মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, হাঁপানি ও হৃদরোগীদের ব্যস্ত সড়ক, নির্মাণকাজের এলাকা ও ধুলাবালিপূর্ণ স্থান থেকে দূরে থাকা জরুরি। পাশাপাশি খোলা বাতাসে দৌড়, জগিং ও ভারী ব্যায়াম এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে, কারণ শারীরিক পরিশ্রমের সময় দ্রুত শ্বাস গ্রহণের ফলে দূষিত কণা শরীরে প্রবেশের মাত্রা বেড়ে যায়। এক সময়ের নির্মল বাতাসের শহর রাজশাহীর এই অবক্ষয় সচেতন মহলকে চরমভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

অথচ ২০১৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাতাসের ক্ষতিকর কণা প্রায় ৬৭ শতাংশ কমিয়ে বিশ্বজুড়ে দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল রাজশাহী। এমনকি পরবর্তীতেও দেশের আটটি বিভাগীয় শহরের মধ্যে রাজশাহীই ছিল সবচেয়ে কম বায়ুদূষণের শহর, যেখানে বাতাসে অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণার উপস্থিতি ছিল সর্বনিম্ন।

অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, ইটভাটার ধোঁয়া ও যানবাহনের চাপে ঐতিহ্যবাহী এই সবুজ নগরীর বাতাস এখন বিষাক্ত হয়ে উঠছে।

পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বায়ুর মান দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে, তাই নগরবাসীকে নিয়মিত বায়ুমান সূচক পর্যবেক্ষণ করে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। একইসঙ্গে রাজশাহীর পরিবেশবান্ধব সুনাম ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ, সড়কে পানি ছিটানো এবং পরিবেশ রক্ষা আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সোনালী/জগদীশ রবিদাস