ঢাকা | অক্টোবর ১৫, ২০২৬ - ১১:২৬ অপরাহ্ন

শিরোনাম

কিশোর গ্যাংয়ের রক্তক্ষয়ী দাপট: রাজশাহীতে ৩৫ চক্র, সারাদেশে ৩৮৬

  • আপডেট: Thursday, October 15, 2026 - 10:28 pm

স্টাফ রিপোর্টার: প্রকাশ্যে রামদা ও ধারালো অস্ত্র উঁচিয়ে ফিল্মি স্টাইলে মহড়া, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ কিংবা খুন—রাজশাহী মহানগরীসহ সারাদেশে দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। রাজশাহী নগরীতেই অন্তত ৩৫টি অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে, যাদের সদস্য সংখ্যা পাঁচ শতাধিক।

অন্যদিকে সারাদেশে এমন ৩৮৬টি গ্যাংয়ের তথ্য রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায়। কেবল কিশোর নয়, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের আড়ালে এদের পেছনে থাকা প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই এই অপরাধী সিন্ডিকেটগুলো দিন দিন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠছে বলে জানান অপরাধ বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী নগরীর বাকির মোড়ে টাকা ভাঙানো নিয়ে সামান্য তর্কাতর্কির জের ধরে এক দোকানদারকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। স্থানীয়দের মতে, আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব ও ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে নগরীর অলিগলিতে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় এসব উঠতি অপরাধীরা।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডেই কিশোর গ্যাংয়ের উপস্থিতি রয়েছে। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ফয়েজুল কবির সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানান, রাজশাহী নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে সক্রিয় আছে অন্তত ৩৫টি কিশোর অপরাধী চক্র।

এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—টেন স্টার বয়, রাইজিং বয়, অদম্য বালক, গলি বয়, হিটার বয়েজ ও বুলেট গ্যাং। তবে শহরের কিশোর অপরাধ দমনে পুলিশ অত্যন্ত তৎপর রয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাজশাহী নগরীর কিশোর অপরাধী চক্রগুলোর সদস্য সংখ্যা পাঁচ শতাধিক।

অপরাধ বিশ্লেষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুন্সী ইসরাইল হোসেন মনে করেন, এটি কেবল সামাজিক অপরাধ নয়, বরং কাঠামোগত সমস্যা। তিনি বলেন, শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ এবং পারিবারিক নিবিড় নজরদারি।

সারাদেশের উদ্বেগজনক চিত্র:

পুলিশের হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী, সারাদেশে সক্রিয় ৩৮৬টি কিশোর গ্যাংয়ের তালিকাভুক্ত সদস্যদের প্রায় ৮০ শতাংশেরই বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। কিশোর অপরাধী হিসেবে সংজ্ঞায়িত হলেও এসব দলে প্রাপ্তবয়স্ক তরুণদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। ঢাকা মহানগরে সর্বাধিক ১৫৯টি, চট্টগ্রামে ৯৮টি, সিলেটে ১৫টি, গাজীপুর মহানগরে ১৩টি এবং রাজশাহীতে ১৩টি বড় ক্যাটাগরির গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।

এছাড়াও অন্যান্য বিভাগ ও জেলা-উপজেলা পর্যায়েও এদের বিস্তার ঘটেছে। গত এক বছরের ব্যবধানে কেবল রাজধানীতেই সক্রিয় গ্যাংয়ের সংখ্যা ১১৮ থেকে বেড়ে ১৫৯টিতে দাঁড়িয়েছে। কিশোর গ্যাংগুলো এখন আর শুধু বখে যাওয়া কতিপয় কিশোরের বিশৃঙ্খলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

স্থানভেদে জমি ও বাড়ি দখল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, অফিস-আদালতে ভাঙচুর, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবেও এদের ব্যবহার করা হচ্ছে। এই গ্যাংগুলোর পেছনে শতাধিক রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সাবেক জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রভাবশালী ও আবাসন ব্যবসায়ীর পৃষ্ঠপোষকতার তথ্য পাওয়া গেছে।

কিশোর অপরাধের এই বিস্তার রোধে কঠোর অবস্থান নেয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) সায়েদুর রহমান বলেন, সারা দেশে কিশোর গ্যাং ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা তৈরি করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান সত্ত্বেও অপরাধের এই ধরন প্রতিরোধে আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জোর দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

সোনালী/জগদীশ রবিদাস