ঢাকা | মে ২৩, ২০২৬ - ১০:৫৩ অপরাহ্ন

শিরোনাম

রামেক হাসপাতালে ১৭ দিনে প্রাণহানি শূন্য, কমছে নতুন রোগীও

  • আপডেট: Saturday, May 23, 2026 - 10:41 pm

জগদীশ রবিদাস: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশু রোগীর সংখ্যা যেমন কমছে, তেমনি স্বস্তির খবর হচ্ছে গত ১৭ দিনে এখানে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত ৬ মে হামের উপসর্গ নিয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছিল, এরপর ২৩ মে পর্যন্ত আর কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

চিকিৎসকদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য ‘ভিটামিন এ ক্যাপসুল’ আশীর্বাদের মতো কাজ করছে। এটি খাওয়ানোর ফলে শিশুদের শারীরিক জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। গত বছরের জুন এবং চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে নিয়মিত ডোজে শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল দেওয়া সম্ভব হয়নি এবং সে সময় হামের টিকারও কিছুটা সংকট ছিল। এই জোড়া সংকটের কারণেই মূলত রোগটি বড় আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে বর্তমানে জোরদার টিকাদান কর্মসূচির কারণে সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

চাপ কমছে শিশু ওয়ার্ডে: হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, গত জানুয়ারি মাস থেকে এই অঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও মার্চ মাসে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। সে সময় রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর উপচে পড়া ভিড় তৈরি হয়। মাত্র ২০০টি বেডের বিপরীতে ৭০০ থেকে ৮০০ শিশুকে চিকিৎসা দিতে হয়েছে, যার মধ্যে দেড় শতাধিকই ছিল হামের উপসর্গযুক্ত। রাজশাহী বিভাগ ছাড়াও ঢাকা ও খুলনা বিভাগের পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে রোগী আসায় এক এক বেডে ৩-৪ জন শিশুকে রেখেও চিকিৎসা দিতে বাধ্য হন চিকিৎসক ও নার্সরা।

মহামারির এই চরম পর্যায়ে রামেক হাসপতালেই এ পর্যন্ত মোট ৫৭টি শিশু মারা গেছে। তবে গত মার্চ-এপ্রিলের সেই ভয়াবহতা কাটিয়ে টিকাদান শুরুর এক মাসের মাথায় পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। এখন হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তির হার বেশ নিম্নমুখী। গত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৫ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। যেখানে মে মাসের শুরুতে (১ মে) চিকিৎসাধীন রোগী ছিল ১১৪ জন, সেখানে গতকাল শনিবার সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৭৩ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৩ জন শিশু।

রামেক হাসপাতালে এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ১৯ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে, যার মধ্যে মৃত ৫৭ জন বাদে বাকি সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে সুস্থ হলেও কিছু শিশুর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক দুর্বলতা বা জটিলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস জানান, টিকাদানের পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত ভিটামিন এ ক্যাপসুল ও সঠিক চিকিৎসা দেওয়ায় সুফল পাওয়া যাচ্ছে। আক্রান্ত ও মৃত শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা। সেখানেও এখন সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ৮ জেলায় এ পর্যন্ত ল্যাব-নিশ্চিত হামে ৪ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৭৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই মোট ৮২ জন মৃতের মধ্যে রামেক হাসপাতালেই মারা গেছে ৫৭ জন। এছাড়া বগুড়ায় ৮ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনায় ৬ জন করে এবং নওগাঁয় ১ জন শিশু মারা গেছে। পুরো বিভাগে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৯০৬ জন, যার মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫ হাজার ৫১৬ জন। ইতিমধ্যেই সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছে ৫ হাজার ১৩২ জন এবং গতকাল শনিবার পর্যন্ত বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩২৭ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান জানান, পুষ্টিহীনতায় ভোগা শিশুরা হামে আক্রান্ত হলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। গত বছর ও এই বছরের শুরুতে ভিটামিন এ ক্যাপসুলের সরবরাহ না থাকায় এবং টিকার ঘাটতিতে শিশুরা ঝুঁকিতে পড়েছিল। তবে বর্তমানে সরকারি নির্দেশনায় আক্রান্তদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল দেওয়া হচ্ছে, যা জাদুর মতো কাজ করছে। একই সাথে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রাও শতভাগ অর্জিত হয়েছে, যার ফলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটছে।

টিকাদানে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল রাজশাহী বিভাগ:

এদিকে মহামারি মোকাবিলায় রাজশাহী বিভাগে হামের টিকাদান কর্মসূচি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বিভাগের ৮ জেলায় এবার ২০ লাখ ৪৮ হাজার ৪টংবভঁষ ৩৫ জন শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে শনিবার পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা পেরিয়ে ২১ লাখ ১৪ হাজার ৬৪২ জন শিশুকে এই টিকা দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে, যা শতকরা হিসাবে ১০৩.২৩%। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, সংক্রমণ বাড়ার পর সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি হয় এবং তারা নিজ উদ্যোগেই শিশুদের টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। আমাদের মাঠপর্যায়ের ব্যাপক প্রচারণা ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়ার কারণেই এই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ানো সম্ভব হয়েছে।