ঢাকা | সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬ - ১২:০২ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

রাবিতে চার বছরের স্নাতক শেষ হতে সময় লাগছে ছয় বছর

  • আপডেট: Tuesday, September 22, 2026 - 10:29 pm

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) উচ্চশিক্ষার স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তীব্র সেশনজটের কারণে। ফলে চার বছর মেয়াদি স্নাতক সম্মান কোর্স শেষ করতে শিক্ষার্থীদের জীবনের মূল্যবান পাঁচ থেকে ছয় বছর ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। সময়মতো পরীক্ষা না হওয়া, ফল প্রকাশে ধীরগতি, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকের চরম সংকট এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জীবন যেমন দীর্ঘায়িত হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে তাদের মানসিক ও আর্থিক চাপ।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২টি অনুষদের অধীনে থাকা ৫৯টি বিভাগের প্রায় প্রতিটিতেই নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি ব্যাচের শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। স্বাভাবিক নিয়মে চারটি ব্যাচের স্নাতক করার কথা থাকলেও, বাস্তবে কোনো কোনো বিভাগে ছয়টি আবার কোনোটিতে সাতটি ব্যাচের শিক্ষা কার্যক্রম একযোগে চলছে। উদাহরণস্বরূপ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অর্থনীতি, সমাজকর্ম, সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান ও ভূগোল এবং পরিবেশবিদ্যা বিভাগে সাতটি করে ব্যাচ চলছে।

অন্যদিকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, পপুলেশন সায়েন্সেস ও শারীরিক শিক্ষা বিভাগে আছে ছয়টি করে ব্যাচ। একই চিত্র কলা অনুষদেও; সেখানে উর্দু এবং নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগে সাতটি করে ব্যাচ থাকলেও ইংরেজি, ইতিহাস, ফোকলোর, সংস্কৃত ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগে চলছে ছয়টি ব্যাচ।

এছাড়াও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজে সাতটি এবং মার্কেটিং ও ফাইন্যান্সে ছয়টি ব্যাচ রয়েছে। বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের প্রতিটি বিভাগ এবং কৃষি, জীববিজ্ঞান ও চারুকলা অনুষদসহ শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইআর) গড়ে ছয় থেকে সাতটি ব্যাচের ক্লাস-পরীক্ষা চলমান থাকায় পুরো ক্যাম্পাসেই সেশনজটের ভয়াবহ রূপ ফুটে উঠেছে।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিয়মানুযায়ী বর্তমানে ক্যাম্পাসে ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের স্নাতক পর্যায়ে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের যাদের চলতি বছরের শেষে স্নাতকোত্তর শেষ করার কথা, তারা সবে স্নাতকোত্তরে উঠেছেন। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের অনেক শিক্ষার্থী এখনো স্নাতকোত্তরে আটকে আছেন। আবার ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের যাদের এ বছর স্নাতক শেষ হওয়ার কথা, তারা এখনো চতুর্থ বর্ষেই অধ্যয়ন করছেন। এই চরম হতাশার কথা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী আসাদ সাদিক রাফি জানান, চার বছরের অনার্স শেষ করতে তার ছয় বছর লেগেছে। এখন দুই বছর মেয়াদি মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে এক বছর পার হতে চললেও প্রথম সেমিস্টারই শেষ হয়নি।

শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা এই সেশনজটের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। সময়মতো কারিকুলাম প্রণয়ন না করা, কার্যকর একাডেমিক ক্যালেন্ডারের অভাব, শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সংকট এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফিলতিকে তারা প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি প্রায় এক দশক আগে চালু হওয়া সেমিস্টার পদ্ধতিকেও অনেকে দায়ী করছেন।

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. আক্তার বানুর মতে, সেমিস্টার পদ্ধতিতে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ক্লাস, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা অনেক সময়ই বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। একটি পরীক্ষা শেষ না হতেই আরেকটির সময় চলে আসায় শিক্ষকদের চরম চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়।

এই সেমিস্টার পদ্ধতির সফল বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক ও অবকাঠামো অপরিহার্য হলেও রাবিতে তা নেই। বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১ হাজার ২০০ জন, অর্থাৎ প্রতি ২৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য গড়ে একজন মাত্র শিক্ষক রয়েছেন। শ্রেণিকক্ষ সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে।

মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি ড. এম বোরাক আলী জানান, তার বিভাগে ছয়টি ব্যাচে গড়ে ১১৫ জন করে শিক্ষার্থী থাকলেও শ্রেণিকক্ষ রয়েছে মাত্র চারটি। প্রতিটি কক্ষে মাত্র ৩৩টি বেঞ্চ থাকায় পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। তবে আশার কথা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সেশনজট নিরসনে কাজ শুরু করেছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, সেশনজট শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে একাডেমিক শাখা-১ এবং উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) দপ্তর সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এরই মধ্যে ২০২৪ সালের আটকে থাকা ফলগুলো দ্রুত প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন এই সংকট দ্রুত সমাধানে বদ্ধপরিকর।