হুমকির মুখে জনস্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষি: বরেন্দ্র অঞ্চলে বিষাক্ত পার্থেনিয়ামের আগ্রাসন
সোনালী ডেস্ক: রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের সমগ্র উত্তরাঞ্চলে বিষাক্ত ‘পার্থেনিয়াম’ আগাছার বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষিজমি, রাস্তার ধার, রেললাইন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ এবং পতিত জমিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এ আক্রমণাত্মক উদ্ভিদটি কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন এক বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। অত্যন্ত ক্ষতিকর এই আগাছার বীজ বাতাসে উড়ে সহজেই দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। কড়া রোদ ও খরা সহনশীল এই উদ্ভিদের বীজ মাটির নিচে প্রায় এক যুগ পর্যন্ত সুপ্তাবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে। ফলে ফসলের পুষ্টি উপাদান শুষে নেয়ার পাশাপাশি এটি এখন বরেন্দ্রভূমির চাষিদের অন্যতম বড় আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। তবে উদ্ভিদটির ভয়াবহতা সম্পর্কে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের মাঝে এখনো সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজশাহীর চারঘাট প্রতিনিধি জানান, উপজেলার ইউসুফপুর, নিমপাড়া, সরদহ, শলুয়া, ভায়ালক্ষ্মীপুর ও চারঘাট সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার পাশে ও ফসলি জমিতে ব্যাপক হারে জন্ম নিয়েছে এই পার্থেনিয়াম। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, জমি পরিষ্কার করার কিছুদিন পরই এটি আবার গজিয়ে উঠছে, যার ফলে চাষাবাদে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে এবং ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একইভাবে নাটোরের বিভিন্ন ইউনিয়ন, পৌর এলাকা এবং রেললাইনের ধারে কয়েক বছর ধরে পার্থেনিয়ামের বিস্তার বেড়েই চলেছে। সেচের পানি ও গোবরের মাধ্যমে এর ক্ষুদ্র বীজ চারিদিকে ছড়াচ্ছে এবং কৃষকেরা একবার নিধন করার পর ফসলের চারা গজানোর সঙ্গে সঙ্গে এটি আবার বেড়ে উঠছে। নওগাঁর শাহ কৃষি লাইব্রেরি জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম শাহ মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি পার্থেনিয়ামের জন্য খুবই উপযোগী হওয়ায় এর বিস্তার দ্রুত ঘটছে। এখানকার কৃষকেরা খেতে আগাছা পরিষ্কারের বিষয়ে সতর্ক হলেও এটি কতটা বিষাক্ত, সে সম্পর্কে তাদের সঠিক ধারণা নেই।
পেশা ও পরিবেশ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপ-কলেজ পরিদর্শক ডা. জোহা মোহাম্মদ মেহেরওয়ার হোসেন জানান, তিনি ২০১১ সাল থেকে পার্থেনিয়াম নিয়ে গবেষণা করছেন। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে রাজশাহী ও আশপাশের এলাকায় চালানো তাঁর এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় পার্থেনিয়ামের বিস্তার রয়েছে, সেখানকার মানুষ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অ্যালার্জি ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছেন। এই উদ্ভিদের সংস্পর্শে আসা রোগ সহজে সারতে চায় না এবং উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। দেখতে অনেকটা প্রাপ্তবয়স্ক ধনে গাছের মতো এই উদ্ভিদের ছোট সাদা ফুল ও চিকন পাতা রয়েছে, যার ফুলের রেণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে অ্যালার্জি, ত্বকের চুলকানি, অসহ্য মাথাব্যথা, ঘনঘন জ্বর ও চোখের সমস্যা তৈরি করতে পারে। গবাদিপশু চারণের সময় এটি গায়ে লাগলে শরীর ফুলে যাওয়া, তীব্র জ্বর ও ওলান পেকে যাওয়ার মতো রোগ হয় এবং পশুর পেটে এই আগাছা প্রবেশ করলে তীব্র বিষক্রিয়া দেখা দেয়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্টিভ অ্যাডকিনস একদল দেশীয় কৃষি বিজ্ঞানীসহ যশোর অঞ্চলে প্রথম এই আগাছা শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কৃষি বিজ্ঞানী ড. ইলিয়াছ হোসেনের নেতৃত্বে দেশের ৩৫টি জেলায় জরিপ চালানো হয়, যেখানে ডা. জোহা মেহেরওয়ারও যুক্ত ছিলেন। ২০১৯ সালে একটি আন্তর্জাতিক কৃষি সাময়িকীতে প্রকাশিত ওই গবেষণাপত্রে পার্থেনিয়ামকে দেশের সবচেয়ে উদ্বেগজনক আগাছা হিসেবে চিহ্নিত করে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলা হয়। বিশেষ করে ভারতের সীমান্তবর্তী বৃহত্তর রাজশাহী, যশোর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।
নলডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জুনাইদ হোসেন লেলীন, উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন ডা. পারভেজ আহমদ, চারঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আল মামুন হাসান এবং নলডাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ সবুজ আলী জানান, প্রতিকূল পরিবেশেও এই উদ্ভিদ সহজে বেঁচে থাকে এবং এটি নিয়ন্ত্রণে এখনই ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে কৃষকদের সচেতন করা জরুরি। কৃষি বিভাগ থেকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে যে, কৃষকদের এই আগাছাটি ফুল ও বীজ হওয়ার আগেই উপড়ে ফেলতে হবে অথবা গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করে নিরাপদ উপায়ে উপড়ে মাটিতে পুঁতে বা আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করতে হবে। সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে আগামীতে এই অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য ও কৃষি খাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।











