চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের বাম্পার ফলন: তবুও লোকসানের ঝুঁকিতে চাষিরা
ডাবলু কুমার ঘোষ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে: দেশের আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি মৌসুমে আম উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ঘিরে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। জেলার হাজার হাজার কৃষক, বাগান মালিক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ী এখন আম সংগ্রহ ও বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে মৌসুমের শুরুতে উৎপাদন ভালো হওয়া এবং তীব্র গরমের কারণে বাজারে আমের সরবরাহ একযোগে বেড়ে গেছে। ফলে তুলনামূলক কম দামে আম বিক্রি হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় চাষিরা।
ব্যবসায়ী ও কৃষি বিভাগ আশা করছে, সামনের দিনগুলোতে আমের বাজার দর ও বেচাকেনা আরও বাড়বে। তবে কৃষক সংগঠনগুলোর মতে, আম প্রক্রিয়াজাতকরণে সরকারি উদ্যোগ না নেওয়া পর্যন্ত আমচাষীদের ভাগ্যের স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়।
আমের বর্তমান বাজার দর ও চাষিদের হতাশা:
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটসহ বিভিন্ন বড় আমবাজার ও পাইকারি মোকামগুলোতে নানাজাতের আম উঠতে শুরু করেছে। প্রতিদিন জেলাজুড়ে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হচ্ছে এবং গড়ে ২০০ ট্রাক আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন জাতের গুটি আম প্রতি মণ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, লক্ষণভোগ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, গোপালভোগ ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত খিরসাপাত ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা দরে বেচাকেনা হচ্ছে। আর সপ্তাহখানেক বাদে ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ফজলি আম বাজারে আসবে।
কানসাটের আমচাষি রবিউল হক জানান, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে এবার উৎপাদন খরচ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। অথচ বাজারে গত বছরের তুলনায় মণপ্রতি ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত কম দামে আম বিক্রি হচ্ছে। ফলে ন্যায্যমূল্য না পেলে চাষিদের বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে।
আবাদ ও ফলনের চিত্র:
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. ইয়াছিন আলী জানান, আধুনিক ও বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে আমচাষে নতুন উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসায় গত ১০ বছরে জেলায় প্রায় ১৩ হাজার ৬২০ হেক্টর জমিতে আবাদ বেড়েছে। এবার জেলার ৫টি উপজেলায় মোট ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে নানাজাতের আমের চাষ হয়েছে, যেখানে মোট আম গাছের সংখ্যা ৮ লাখ ৫২ হাজার ৪৯০টি।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সামনে কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা না দিলে চলতি মৌসুমে জেলায় আমের বাম্পার ফলন হবে এবং আমভিত্তিক ব্যবসা হবে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার কোটি টাকার, যা গত বছর ছিল প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পর্যাপ্ত মুকুল ও গুটি এলেও পরবর্তী সময়ে কিছু এলাকায় শিলাবৃষ্টি, কালবৈশাখী ঝড় ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে আমের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও রোগবালাইয়ের চ্যালেঞ্জ:
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের (আম গবেষণা কেন্দ্র) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরিফ উদ্দিন জানান, জলবায়ু পরিবর্তন এবার আম উৎপাদনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় অনাবৃষ্টি এবং হঠাৎ ঝড়ো আবহাওয়া বাগানে প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক চাষি সময়মতো বালাইনাশক স্প্রে করতে না পারায় হপার পোকা, অ্যানথ্রাকনোজ ও পাউডারি মিলডিউ রোগের প্রকোপ দেখা গেছে। তবে কৃষি বিভাগ ও আম গবেষণা কেন্দ্র থেকে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবিধা না থাকায় প্রতিবছর জেলায় হাজার হাজার টন আম নষ্ট হচ্ছে, যা রপ্তানি পণ্য হতে পারত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক জানান, বিশ্ববাজারে আমভিত্তিক পণ্যের বাজার যেখানে ২৮ বিলিয়ন ডলার, সেখানে বাংলাদেশে পর্যাপ্ত কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও বড় কোনো প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে ওঠেনি।
শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খান শামিম বলেন, সরকারি বা বেসরকারিভাবে আমের জুস, জেলি, আমসত্ত্ব, পাউডার, ম্যাংগো বার ও আমচুর তৈরির বড় উদ্যোগ নেই। প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগের অভাবে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও বড় পরিসরে এগোতে পারছেন না। গোমস্তাপুরের বাগানমালিক মিজানুর রহমান ও ম্যাংগো ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব আহসান হাবীব জানান, জেলায় প্রতি বছর ৫ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টন আম উৎপাদন হয়। আধুনিক প্যাকেজিং হাউস, হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা গেলে এ খাত থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা আয় সম্ভব।
রপ্তানি ও বিপণন সম্ভাবনা:
বিগত কয়েক বছর ধরে স্থানীয় উদ্যোক্তারা রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে আম রপ্তানি করছেন। গত বছর উত্তম কৃষিচর্চা (এঅচ) মেনে এ জেলার ১৪৪ জন চাষি ২১টি দেশে ৮৩৯ মেট্রিক টন আম রপ্তানি করেছিলেন। এবারও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও রপ্তানিকারকরা বাগান পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কৃষি বিভাগের আশা, গতবারের তুলনায় এবার বেশি পরিমাণ আম রপ্তানি হবে।
তবে জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম জানান, কোল্ড স্টোরেজের অভাব এবং দূরপাল্লার পরিবহনে আম নষ্ট হওয়া বড় একটি সমস্যা। কৃষকদের সুবিধার্থে বর্তমানে ১৫টি স্কুলে ৩৭৫ জন চাষি ও উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা ঢাকা ও চট্টগ্রামের সুপার চেইন শপগুলোর সাথে সরাসরি লিংক স্থাপন করে ভালো দাম পেতে পারেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, আমের রাজধানীতে বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও সঠিক পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের আম রপ্তানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ই-কমার্সে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হলে এবং আমকে ঘিরে শিল্প গড়ে উঠলে এই অঞ্চলের হাজারো মানুষের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে যাবে।











