ঢাকা | অক্টোবর ১৯, ২০২৬ - ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

উত্তরাঞ্চলে সক্রিয় জাল নোট চক্র

  • আপডেট: Sunday, October 18, 2026 - 11:18 pm

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে আশঙ্কাজনকভাবে বিস্তার ঘটেছে জাল টাকা কারবারিদের অপতৎপরতা। বাজারে আসা নতুন ব্যাংক নোট সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পর্যাপ্ত ধারণা না থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণ জালিয়াতি চালিয়ে যাচ্ছে একাধিক প্রতারক চক্র।

এমনকি জনবহুল এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে আস্তানা গেড়ে জাল টাকা তৈরির কারখানা স্থাপন এবং সীমান্ত ঘেঁষা এলাকাগুলোতে মাদকের আড়ালে এসব অবৈধ নোট ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ধরা পড়েছে। এতে করে ওই অঞ্চলের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আর্থিক ঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও নওগাঁর সীমান্ত এলাকাগুলোতে জাল টাকার এই অবৈধ কারবার সবচেয়ে বেশি সংগঠিত হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় মাদক কেনাবেচার পাশাপাশি প্রতারণার উদ্দেশে জাল নোটের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।

পুলিশ ও এসআরবি-৫ (সাবেক র‌্যাব-৫)-এর সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি সফল অভিযানে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি জাল নোট, নোট তৈরির আধুনিক সরঞ্জাম এবং চক্রের একাধিক সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এই জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসছে। সম্প্রতি সবচেয়ে আলোচিত ও অভিনব প্রতারণার ঘটনাটি ঘটে রাজশাহী মহানগরীর সাহেববাজারের ‘আশা জুয়েলার্স’-এ।

বোয়ালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাছুমা মোস্তারি জানান, গত ২৭ সেপ্টেম্বর নিজেকে সেনাসদস্য পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি দোকান থেকে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি স্বর্ণের চেইন পছন্দ করেন। দাম পরিশোধের সময় তিনি নতুন ১ হাজার টাকা মূল্যমানের ১১৫টি নোট প্রদান করেন। দোকানমালিকের বাবা নোটগুলোর বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে পাশের দোকানে যাচাই করতে যাওয়ার সুযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি চেইনটি নিয়ে সটকে পড়েন।

পরবর্তীতে তদন্তের ধারাবাহিকতায় গত ১৩ অক্টোবর ঢাকার খিলক্ষেত এলাকা থেকে মূল অভিযুক্ত মো. রিয়াজুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে রাজশাহী মহানগর পুলিশ। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন ঢাকার একটি জুয়েলারি দোকানের মালিক রোমানকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং উদ্ধার করা হয় রাজশাহীর দোকান থেকে হাতিয়ে নেয়া সেই চেইনটি। পুলিশি তদন্তে আরও জানা যায়, একই ব্যক্তি গত ৬ অক্টোবর বগুড়ার নিউমার্কেট এলাকার ‘তামান্না জুয়েলার্স’ থেকেও একইভাবে ১ লাখ ২২ হাজার টাকার জাল নোট গচ্ছিত রেখে অন্য একটি স্বর্ণের চেইন হাতিয়ে নেন, যা পরবর্তীতে পুলিশ উদ্ধার করেছে।

অন্য একটি বড় অভিযানে গত ৮ আগস্ট রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার বালুবাগান এলাকায় অভিযান চালায় এসআরবি-৫। সেখানে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে চালানো জাল নোট তৈরির কারখানার সন্ধান মেলে এবং ঘটনাস্থল থেকে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন দেশের ৪৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬০০ টাকা মূল্যমানের জাল নোট এবং জাল টাকা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এসআরবি-৫ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়সাল ইসতিয়াক জানান, একটি ভাড়া বাসায় জাল নোট ছাপিয়ে তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হচ্ছিল। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর চক্রের অন্যান্য সহযোগীদের শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে গত ২৮ জুন রাজশাহীর মোহনপুরের কেশরহাট বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৯৩ হাজার টাকা মূল্যমানের জাল নোট এবং ৩৮৭ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ নায়েব আলী নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। অন্যদিকে নাটোরেও একই চক্রের সদস্য ধরা পড়েছে। নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার রাজাপুর বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৭ লাখ ৯ হাজার ৫০০ টাকার জাল নোটসহ মোস্তফা আলী নামে এক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৫।

উত্তরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই জাল টাকার চক্রের মূল উপড়ে ফেলতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এখন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আশিক সাঈদ জানিয়েছেন, জাল নোট কারবারের মূল উৎস, মূল সরবরাহকারী এবং এই সংক্রান্ত অবৈধ অর্থ প্রবাহের উৎস শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। একই সাথে নতুন টাকার নোট লেনদেনে ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।