চাঁপাইনবাবগঞ্জে কাগজে-কলমে সংকট নেই, মাঠে সারের হাহাকার
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যুরো: চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমন মৌসুমে সরকারি নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। ডিলারের দোকানে ঘুরেও সার না মিললেও খুচরা দোকানে বাড়তি দামে ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে বেশি দামে সার কিনে উৎপাদন খরচ বাড়ছে কৃষকদের।
কৃষকদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। ৫০ কেজির এক বস্তা সারে স্থানভেদে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। সরকারি দরে না পেয়ে খুচরা বাজারে ডিএপি সার ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
সদর উপজেলার ঝিলিম ইইনিয়নের আতাহির গ্রামের কৃষক আজহারুল ইসলাম ২২ বিঘা জমিতে আমন আবাদ করেছেন। তিনি জানান, প্রথম দফায় প্রয়োজন ৮ থেকে ১০ বস্তা সার হলেও ডিলারের কাছ থেকে পেয়েছেন মাত্র ৫ বস্তা। একই অভিযোগ মিলকির কৃষক সৈবুর রহমানের। ১৪ বিঘা জমিতে চাষ করে প্রয়োজনের সময় সরকারি দামে সার না পাওয়ায় বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৯৮ শতাংশ জমিতে রোপণ শেষ হয়েছে। আগস্টে জেলায় ১০ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরের জন্যও নতুন বরাদ্দ এসেছে।
এদিকে অবৈধভাবে সার মজুত ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে সদর, নাচোল ও গোমস্তাপুরে অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন। গত আগস্ট মাসে নাচোল উপজেলায় ৩টি পৃথক ভ্রাম্যমান অভিযানে তিন সার বিক্রেতাকে ৩০ হাজার, ৫ হাজার ও ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জব্দ করা সার পরে নির্ধারিত দামে কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
উদ্যোক্তা গোলাম মোস্তফা সুমন জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত ১৫ বছরে ধানের পাশাপাশি আম, পেয়ারা, ড্রাগন, মাল্টা, পেপে বিভিন্ন ফল চাষ এবং মাছের উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়ে একরকম বরেন্দ্র অঞ্চলে বিপ্লব ঘটেছে। অথচ কৃষিবিভাগ এবং প্রাণিসম্পদ দপ্তর ফল চাষ এবং মাছ চাষের জন্য অতিরিক্ত সার বরাদ্দের ব্যাপারে কার্যকরী চাহিদাপত্র না পাঠানোয় জেলায় সার নিয়ে হাহাকার লেগেছে।
বিশেষ করে আগষ্ট-সেপ্টেম্বরে বেশিরভাগ বাগানের আম বিক্রি শেষে বাগানের পরিচর্যা হিসেবে কৃষক এবং বাগান মালিকররা গাছের গোড়ায় সার দিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। আর এসময়ই বিভিন্ন ফল এবং মাছ চাষে অতিরিক্ত সার প্রয়োজন হয়।
একাধিক ডিলারও অভিযোগ করে বলেন, এ অঞ্চলের মাসওয়ারী বিভিন্ন ফসলকে সামনে নিয়ে যদি কৃষিবিভাগ সারের চাহিদাপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায় এবং সে অনুসারে বরাদ্দ দিলে সারের সংকট থাকবে না। তবে প্রতিমাসে জেলার চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ না দেয়ার অভিযোগ করেন একাধিক ডিলার। আর এ কারণে জেলায় সার নিয়ে যত ঝামেলা।
এদিকে, দাম বৃদ্ধিতে খুচরা ব্যবসায়ীরা দায় চাপাচ্ছেন ডিলারদের ঘাড়ে। আর ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, জেলা ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি দানিয়ুল হক জানান, সিন্ডিকেট নয়; চাহিদা অনুযায়ী কৃষি বিভাগ থেকে বরাদ্দ না পাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।
তবে জেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই বলে দাবি করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা সার মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব আতিকুল ইসলাম। তাঁর মতে, টিএসপি ও ডিএপির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। কৃষকদের সুষম মাত্রায় সার ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।
জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি আবু ছালেহ মোঃ মুসা জঙ্গী বলেন, বরাদ্দের শতভাগ সার উত্তোলন করে বাজারে পাঠানো হয়েছে। তবে বিভিন্ন ফসলে বাড়তি চাহিদার কারণে কিছু এলাকায় চাপ তৈরি হতে পারে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং অসাধুদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান ও মনিটরিং অব্যাহত থাকবে।











