৩০ ঘণ্টা পর রাজশাহীতে বাস চলাচল শুরু
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের জেরে বন্ধ থাকার ৩০ ঘণ্টা পর অবশেষে রাজশাহীর সব রুটে বাস চলাচল শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে সব রুটে পুনরায় গণপরিবহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এর আগে সন্ধ্যায় রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (ট্রাফিক) নূর আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে বাস শ্রমিক নেতাদের এক ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, নির্বাচন কমিটিতে রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল থাকবেন না। এই সিদ্ধান্তের পর শ্রমিকেরা তাদের ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেন।
তবে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্বাচনকালীন আহ্বায়ক কমিটিতে ‘পাখি গ্রুপ’ ও ‘মোমিন গ্রুপ’ থেকে চারজন করে মোট আটজন সদস্য অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। ওই কমিটিতে প্রশাসনের একজন প্রতিনিধিও থাকবেন। তারাই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।
বাস শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সদস্যরা বেশ কয়েক মাস ধরে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শ্রমিকেরা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন এবং গত ২৩ এপ্রিল নির্বাচন দাবিকারী শ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।
অভিযোগ রয়েছে, জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও মহানগর শ্রমিক দলের আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম পাখিসহ তার অনুসারীরা সেদিন বাস টার্মিনাল এলাকায় ব্যাপক বোমাবাজি করেন। পরবর্তী সময়ে এই রফিকুল ইসলাম পাখিকে সভাপতি করে ইউনিয়নের নতুন কমিটি ঘোষণা করে সড়ক পরিবহন ফেডারেশন। সাধারণ শ্রমিকেরা এই কমিটি প্রত্যাখ্যান করে গত মে মাসে কয়েক দফা ধর্মঘট ডাকেন। তখন তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) হস্তক্ষেপ করে ঈদের পর নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়েছিল।
তবে নির্বাচনের চলমান সংকট ও ধর্মঘটের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম শ্রমিকদের দাবি নাকচ করে দিয়ে জানান, তিনি নিজেই একটি নির্বাচনী কমিটি করার প্রস্তাব রেখেছিলেন। কিন্তু সেই প্রস্তাব না মেনে শ্রমিকেরা বাস চলাচল বন্ধ করে দেন, যা তারা করতে পারেন না। তার পরেও বিষয়টি সুষ্ঠু সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সোমবার (১৩ জুলাই) রাত ৮টা থেকে রাজশাহী থেকে আন্তজেলা বাস চলাচল বন্ধ করে দেন শ্রমিকেরা। তবে যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে ওই দিন রাতে দূরপাল্লার বাসগুলো ছেড়ে যেতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল থেকে সব রুটের বাস চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।
শ্রমিকদের দাবি, নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে সোমবার বিকেলে নিজ কার্যালয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। ওই সভায় শ্রমিক নেতা রফিকুল ইসলাম পাখির অনুসারী নজরুল ইসলাম হেলালও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বিরোধী পক্ষের শ্রমিক নেতারা জেলা প্রশাসককে পরামর্শ দেন, সংগঠনের সাধারণ সভা ডেকে যেন নির্বাচনী বোর্ড গঠন করা হয়।
কিন্তু জেলা প্রশাসক জানান, এই মুহূর্তে সাধারণ সভা করা সম্ভব নয়। এরপর তিনি নজরুল ইসলাম হেলাল ও পুলিশ-প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি নির্বাচনী কমিটি গঠন করার প্রস্তাব দিলে হেলাল-পাখিবিরোধী শ্রমিকেরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের শ্রমিক নেতাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয় এবং হেলাল-পাখিবিরোধী শ্রমিকেরা ডিসির সামনেই বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সভাকক্ষ ত্যাগ করেন, যার জেরে রাত থেকেই বাস বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে গত সোমবার রাতে ডিসির কার্যালয় থেকে দুই পক্ষের নেতারা শিরোইল বাস টার্মিনাল এলাকায় ফিরলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে কিছু শ্রমিক নজরুল ইসলাম হেলালের ব্যক্তিগত চেম্বার ভাঙচুর করেন এবং চেম্বারে লুটপাট চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন নজরুল ইসলাম হেলাল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিক নেতা মোমিনুল ইসলাম মোমিন বলেন, জেলা প্রশাসক একটি পক্ষের অবস্থান নিয়েছিলেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে তারা সাধারণ সভা করে নির্বাচনী কমিটি করার দাবি জানিয়েছিলেন, কিন্তু ডিসি নজরুল ইসলাম হেলালকে কমিটিতে রেখে দিতে চান। হেলাল কমিটিতে থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলেই সাধারণ শ্রমিকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে বাস বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে সব অভিযোগের বিষয়ে রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, মিটিংয়ে কথা-কাটাকাটি হতেই পারে, কিন্তু তার জেরে বাস বন্ধ করে দেওয়া কিংবা ব্যক্তিগত চেম্বারে হামলা চালানো কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। তারা বাস বন্ধ করার ঘোষণা দিলেও মালিকপক্ষ থেকে সবসময় বাস চালু রাখার পক্ষেই সিদ্ধান্ত ছিল।











