ঢাকা | জুন ২৫, ২০২৬ - ১:২৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

তানোরে একের পর এক ফসলে লোকসানে দিশেহারা চাষিরা

  • আপডেট: Wednesday, June 24, 2026 - 10:51 pm

আলুর পর বোরো-আমের দরপতন:

তানোর প্রতিনিধি: রাজশাহীর তানোরে একের পর এক কৃষিপণ্যের ভয়াবহ দরপতনে চরম সংকটে পড়েছেন স্থানীয় চাষিরা। আলু ও পেঁয়াজের পর এবার বোরো ধান এবং আমের বাজারে ধস নামায় উৎপাদন খরচ তোলা নিয়েই বিপাকে পড়েছেন তারা। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্যমূল্যের অভাবে অব্যাহত লোকসানের মুখে পড়ে অনেক কৃষক ব্যাংক ও এনজিও ঋণের কিস্তি শোধ করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ঋণের দায়ে কেউ কেউ শেষ সম্বল হারাচ্ছেন, আবার কেউ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন বলে মাঠপর্যায়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

চলতি মৌসুমে তানোরে আলুর জমিতে চাষ করা বোরো ধান কাটা-মাড়াই পুরোদমে চললেও কৃষকদের মুখে হাসি নেই। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ (৪০ কেজি) ধান মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। সেচ, সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় ধানের উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে।

উপজেলার কলমা ইউনিয়নের বিল্লী গ্রামের কৃষক সারোয়ার জাহান জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ২০ বিঘা জমিতে ব্রি-৭৬ জাতের বোরো ধান চাষ করেছিলেন। ধান কাটার পর স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে গেলে ব্যবসায়ীরা আগ্রহ দেখাননি; পরে এক ব্যবসায়ী মাত্র ৮০০ টাকা মণ দরে ধান কিনতে রাজি হন। এই দামে ধান বিক্রি করলে শুধু ধান চাষেই তার অন্তত ৫০ হাজার টাকা লোকসান হবে। একই পরিস্থিতির মুখোমুখি তানোরসহ পার্শ্ববর্তী গোদাগাড়ী, মোহনপুর, পবা ও নওগাঁর মান্দা উপজেলার হাজারো বোরো চাষি।

ধানের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল আমের বাজারেও এবার বড় ধরনের ধস নেমেছে। বাগান মালিকদের দাবি, গত এক দশকের মধ্যে এবারই আমের দাম সবচেয়ে নিচে নেমে গেছে। পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকায় অনেক বাগানের পাকা আম গাছেই নষ্ট হচ্ছে। বাজারে বর্তমানে বিভিন্ন জাতের আম প্রতি কেজি মাত্র ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাগান পরিচর্যা, সেচ, কীটনাশক ও পরিবহন খরচ বিবেচনা করলে এই দামে উৎপাদন খরচও উঠছে না। বাজার পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আম চাষিদের বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হবে।

তানোর পৌরসভার কালীগঞ্জহাট মহল্লার আলু চাষি রনি জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ৩০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন, যা বর্তমানে হিমাগারে সংরক্ষিত রয়েছে। উৎপাদন ও হিমাগার ভাড়া বাবদ প্রতি কেজিতে তার খরচ পড়েছে প্রায় ২৪ টাকা, অথচ বর্তমানে বাজারে আলুর কেজি মাত্র সাড়ে ১৭ টাকা। দাম না বাড়লে তার প্রায় ২০ লাখ টাকা লোকসান হবে।

একই অবস্থা পেঁয়াজ ও রসুনের বাজারেও। বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা এবং রসুন ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উপজেলার পাঁচন্দর গ্রামের রসুন চাষি সাদেক জানান, গত বছর লোকসান করায় এবার রসুন বিক্রি না করে বাড়িতেই জমিয়ে রেখেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, দেশে পর্যাপ্ত রসুন উৎপাদন হলেও বিদেশী রসুন আমদানির কারণে স্থানীয় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, জুন মাসের শেষ দিকে ব্যাংক ক্লোজিং থাকার কারণে অনেক চালকল মালিক ধান ক্রয়ে ধীরগতি দেখাচ্ছেন।

ফলে বাজারে ধানের চাহিদা কমে দাম নিম্নমুখী হয়েছে। তবে জুলাই মাস থেকে বাজারে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে তারা আশা করছেন। তানোর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ হাজার ২০০ হেক্টর নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে ১৪ হাজার ১৩০ হেক্টর; অর্থাৎ ৭০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়নি। অন্যদিকে, এবার আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ হাজার ১৯ হেক্টর, যা গত মৌসুমের (১৩ হাজার ১১৫ হেক্টর) তুলনায় ১,২০০ হেক্টর কম।

কৃষিপণ্যের দামের বিষয়ে জানতে চাইলে তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, কৃষি বিভাগের মূল কাজ হচ্ছে চাষাবাদে রোগ-বালাই দূর করতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ফসলের বাজারমূল্যের বিষয়টি মূলত কৃষি বিপণন বিভাগের আওতাধীন।

কৃষি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কৃষকদের এই ধারাবাহিক লোকসান থেকে বাঁচাতে সরকারকে দ্রুত বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার, সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল ক্রয় এবং আমদানি নীতিতে সমন্বয় করতে হবে। অন্যথায় কৃষকেরা চাষাবাদে আগ্রহ হারালে তা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।