ঢাকা | জুন ২, ২০২৬ - ১:৫১ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

নন্দনতত্ত্বের অপূর্ব মেলবন্ধন কুসুম্বা মসজিদ

  • আপডেট: Monday, June 1, 2026 - 10:00 pm

সোনালী ডেস্ক: উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর জেলা নওগাঁর মান্দা উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদ। প্রায় পাঁচ শতাব্দী পুরোনো এই মসজিদটি শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। অসাধারণ নকশা ও সৌন্দর্যের কারণে দেশের পাঁচ টাকার নোটেও স্থান পেয়েছে কুসুম্বা মসজিদের ছবি। নওগাঁ জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে কুসুম্বা ইউনিয়নের কুসুম্বা গ্রামে অবস্থিত মসজিদটি প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী ও মুসল্লির পদচারণায় মুখর থাকে। রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের মান্দা ব্রিজের পশ্চিম পাশে অবস্থিত এই স্থাপনাটি বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণ।

মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে প্রায় ১০০ বিঘা আয়তনের একটি বিশাল দিঘী। প্রায় ১২০০ ফুট দীর্ঘ ও ৯০০ ফুট প্রশস্ত এই জলাধার এক সময় স্থানীয় বাসিন্দা ও মুসল্লিদের পানির চাহিদা পূরণ করত। বর্তমানে এটি মসজিদের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করেছে। কুসুম্বা মসজিদ উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৫৮ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৪২ ফুট বিস্তৃত। প্রায় ছয় ফুট পুরু দেয়াল এবং পাথর আবৃত বর্হিভাগ মসজিদটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। সম্মুখভাগে রয়েছে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার। চার কোণায় রয়েছে চারটি অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ। ছাদের ওপর দুটি সারিতে নির্মিত ছয়টি গম্বুজ সুলতানি স্থাপত্যের সৌন্দর্য বহন করে। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মসজিদের কয়েকটি গম্বুজ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরবর্তীতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংস্কার করে এর সৌন্দর্য পুনরুদ্ধার করে।

অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য: মসজিদের ভেতরে দুটি বৃহৎ পাথরের স্তম্ভ পুরো ছাদের ভার বহন করছে। পশ্চিম দেয়ালে থাকা তিনটি মেহরাবে ঝুলন্ত শিকল, ফুল ও লতাপাতার সূক্ষ্ম অলংকরণ সুলতানি শিল্পকলার উৎকর্ষতার পরিচয় বহন করে। মসজিদের ভেতরে একসময় একটি দোতলা ঘর ছিল, যাকে বলা হতো জেনানা গ্যালারি বা মহিলাদের নামাজের ঘর। উত্তর দিকের মেহরাবের সামনে পাথরের পিলারের ওপর এই ঘরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। মসজিদের সম্মুখভাগে রয়েছে খোলা প্রাঙ্গণ ও পাথর বসানো সিঁড়ি, যা সরাসরি দিঘীর দিকে নেমে গেছে। মসজিদের প্রবেশপথের কাছে একটি বাক্স আকৃতির কালো পাথর রয়েছে।

ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে মতভেদ: মসজিদের নির্মাণকাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। প্রধান শিলালিপি অনুযায়ী, ১৫৫৮ সালে আফগান সুলতান গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহের শাসনামলে মসজিদটি নির্মিত হয়। অন্য একটি শিলালিপির তথ্য অনুযায়ী, ১৪৯৮ সালে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। ফলে মসজিদটির বয়স ৪৬৮ থেকে ৫২৮ বছরের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়। স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে, গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের বেগম কুসুম বিবির নামানুসারে এলাকার নাম হয় কুসুম্বা। পরবর্তীতে সেই নাম থেকেই মসজিদের নামকরণ করা হয়। যদিও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

দর্শনার্থীদের অনুভূতি: মসজিদটি দেখতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। নওগাঁ শহরের পিএম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারিহা হোসেন কৃপা বলেন, পাঁচ টাকার নোটে এই মসজিদের ছবি দেখে অনেক দিন ধরে এখানে আসার ইচ্ছা ছিল। চারপাশের পরিবেশ খুব সুন্দর। এখানে এসে খুব ভালো লাগছে। যদি এখানে একটি রেস্ট হাউস তৈরি করা হয়, তাহলে দূর থেকে আসা দর্শনার্থীদের জন্য আরও সুবিধা হবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী ইরিন জামান বলেন, এত সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ আগে কখনও দেখিনি। ছবিতে দেখেছিলাম, কিন্তু সামনে থেকে দেখলে সৌন্দর্য আরও বেশি অনুভব করা যায়। সামনে বিশাল দিঘী আর চারপাশের পরিবেশ খুবই মনোমুগ্ধকর।

প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন। বিশেষ করে শুক্রবার ও ঈদের জামাতে পুরো প্রাঙ্গণ মুসল্লিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। মসজিদের খতিব মাওলানা মোস্তফা আল-আমিন বলেন, মসজিদের ভেতরে চারটি কাতারে প্রায় ৮০ জন মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। এছাড়া সামনের খোলা প্রাঙ্গণে প্রায় ৭০০ মুসল্লি জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন। পবিত্র রমজান মাসে এখানে তারাবির নামাজও অনুষ্ঠিত হয়।

পর্যটনের সম্ভাবনা: নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রাচীন এই মসজিদটি দেখতে প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। পর্যটনের সম্ভাবনা আরও বাড়াতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সংরক্ষণ ও পর্যটনবান্ধব উন্নয়ন হলে কুসুম্বা মসজিদ উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। ইতিহাস, স্থাপত্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য সমন্বয় হিসেবে কুসুম্বা মসজিদ আজও বাংলাদেশের গৌরবময় অতীতের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।