ঢাকা | জুন ১, ২০২৬ - ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

রাজশাহীর লাউ যাচ্ছে দেশজুড়ে, হাতবদলেই দাম বাড়ে ১০ গুণ

  • আপডেট: Sunday, May 31, 2026 - 11:07 pm

মিজান মাহী, দুর্গাপুর থেকে: ঈদুল আজহার পরপরই রাজশাহীতে লাউয়ের দামে চরম ধস নেমেছে। উপজেলার পাকা-কাঁচা সড়কের মোড়ে মোড়ে প্রতি পিস লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫ টাকা দরে। অথচ এই লাউ-ই হাতবদল হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছানো মাত্র দাম বেড়ে যাচ্ছে ১০ গুণেরও বেশি। ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা মোটা অঙ্কের মুনাফা করলেও উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় চাষিরা।

লাউ চাষিরা জানান, ঈদের আগে প্রতি পিস লাউ তারা ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু ঈদের মাত্র দুই-তিন দিনের ব্যবধানে সেই লাউ এখন মাত্র ৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এই দামে লাউ বিক্রি করলে খেতের উৎপাদন খরচই উঠবে না বলে জানান তারা।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলার ৯টি উপজেলায় লাউয়ের রেকর্ড পরিমাণ ফলন হয়েছে। কৃষকের উৎপাদিত লাউ প্রতিদিন গ্রামীণ সড়কে ও রাস্তার মোড়ে পসরা সাজিয়ে কেনাবেচা হচ্ছে। সেখান থেকে পাইকাররা ট্রাকে করে এই লাউ সারা দেশে সরবরাহ করছেন।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবার জেলায় ৬৬৬ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ হয়েছে, যা গতবার ছিল ৫২১ হেক্টর। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাউ চাষ হয়েছে দুর্গাপুর, বাঘা, গোদাগাড়ী, পবা ও পুঠিয়া উপজেলায়। সরেজমিনে দুর্গাপুর, পুঠিয়া ও বাগমারাসহ কয়েকটি উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, ফসলের মাঠে মাচায় মাচায় শুধু লাউয়ের সমারোহ। খেত ও রাস্তার মোড়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা পানির দামে লাউ কিনছেন। দুপুর গড়াতেই সেসব লাউ ট্রাকে লোড করে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রত্যন্ত গ্রামের চাষিদের কাছ থেকে ঈদের অজুহাতে নামমাত্র মূল্যে লাউ কিনলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খুচরা বাজারে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে কৃষকদের ঠকাচ্ছেন এবং দূর-দূরান্তে পাঠিয়ে ১০ গুণেরও বেশি লাভ করছেন।

দুর্গাপুর পৌর এলাকার দেবীপুর গ্রামের বাসিন্দা ইমরান আলী মুঠোফোনে বলেন, ঈদের ছুটি শেষে শনিবার চাকরির সুবাদে গ্রামের বাড়ি থেকে নরসিংদী চলে এসেছি। আসার সময় দেখলাম আমাদের বাড়ির সামনের মোড়ে ব্যবসায়ীরা মাত্র ৫ টাকা পিস দরে লাউ কিনছে। আর আজ নরসিংদীর বাজারে এসে দেখি সেই রাজশাহীর লাউ-ই ৬৫ থেকে ৭০ টাকা পিস বিক্রি হচ্ছে! ব্যবসায়ীরা একেকটি লাউয়ে ১০ গুণের বেশি লাভ করছে। এভাবে গ্রাম ও শহরের মধ্যে সবজির দামের বিশাল ফারাক তৈরি করা হচ্ছে।

একই উপজেলার নওপাড়া গ্রামের কামরুল হাসান, যিনি বর্তমানে ঢাকার মহাখালীতে থাকেন, তিনি মুঠোফোনে জানান, এবার ঢাকায় ঈদ করেছি। বাড়ি থেকে পরিচিত লোকের মাধ্যমে কিছু আম ও লাউ পাঠিয়েছে। শুনেছি আমাদের এলাকায় এখন লাউয়ের দাম ৫ টাকা। অথচ ঢাকার বাজারে এসে এই লাউ হয়ে যাচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। ফলে গ্রামের কৃষকরা কখনোই সবজির ন্যায্যমূল্য পান না।

রোববার সকালে দুর্গাপুর উপজেলা সদরের মোড়ে লাউ কিনছিলেন পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুল আলীম। তিনি নিজের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, এখন ঈদের মৌসুম হওয়ায় তীব্র পরিবহন সঙ্কট চলছে। চালক ও হেলপাররা ছুটিতে থাকায় যাতায়াত ও সরবরাহ খরচ অনেক বেড়েছে। এদিকে চাষিদের খেতেও লাউ পচে যাচ্ছে, তাই দাম কম। হাতবদলে দাম বাড়লেও পরিবহন খরচের কারণে আমাদের খুব একটা লাভ থাকে না।

তবে লোকসানের আশঙ্কায় ক্ষোভ প্রকাশ করে লাউচাষি আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আমার ১৫ কাঠা জমির মাচায় প্রচুর লাউ এসেছে। সবেমাত্র বিক্রি শুরু করেছি। প্রথম দিনেই ৪০ পিস লাউ ৩২ টাকা দরে বিক্রি করেছিলাম। কিন্তু ঈদের পর হুট করে দাম পড়ে গেল। এমন দাম থাকলে এবার লাউ চাষে ব্যাপক লোকসান গুণতে হবে।

জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, সিন্ডিকেটের কারণে অনেক সময় গ্রাম ও শহরের মধ্যে সবজির দামে বিশাল ফারাক তৈরি হয়। এ বিষয়ে আমরা নিয়মিত সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে রিপোর্ট পাঠাই।

তিনি আরও বলেন, এবার জেলায় অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি লাউ চাষ হয়েছে। এ অঞ্চলের কৃষকেরা আলু ও পেঁয়াজ তোলার পর সেই জমিতে মাচা তৈরি করে লাউ চাষ করেন। প্রতিদিন পাকা সড়ক বা মোড় থেকে পাইকাররা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে লাউ কিনে তা সারা দেশে সরবরাহ করছেন। আমরা কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাজার মনিটরিংয়ের ওপর জোর দিচ্ছি।