ঢাকা | অগাস্ট ৮, ২০২৬ - ১২:১৬ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

সারা দেশে পৃথক চার দুর্ঘটনায় নারী ও শিশুসহ ১৯ প্রাণহানি

  • আপডেট: Friday, August 7, 2026 - 10:15 pm

মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল:

সোনালী ডেস্ক: সারা দেশে এক দিনেই মহাসড়কে ঝরে গেল ১৯টি তাজা প্রাণ। শুক্রবার বগুড়া, সিলেট ও ঝিনাইদহে সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বগুড়াতেই সকালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসের চাপায় কাজের খোঁজে বের হওয়া ৭ দিনমজুর এবং বিকেলে একই সড়কে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী দম্পতি প্রাণ হারিয়েছেন। অন্যদিকে সিলেটের ওসমানীনগরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক শিশুসহ ৯ জন এবং ঝিনাইদহে দুই ট্রাকের সংঘর্ষে চালকের মৃত্যু হয়েছে।

বগুড়ায় বাসের চাকায় পিষ্ট ৭ দিনমজুর:

শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে। প্রতিদিনের মতো রংপুর, গাইবান্ধা, পাবনা, জয়পুরহাটসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দিনমজুরেরা ভোরে কাজের খোঁজে এরুলিয়া বাজারের শ্রমিক হাটে জড়ো হয়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে নওগাঁ অভিমুখী ‘শাহ ফতেহ আলী পরিবহন’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস দ্রুতগতিতে যাওয়ার সময় হুট করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।

পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানায়, এক মোটরসাইকেল আরোহীকে রক্ষা করতে গিয়ে বাসটি প্রথমে একটি খুঁটিতে সজোরে ধাক্কা দেয় এবং পরবর্তী সময়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুরদের ওপর সরাসরি উঠে পড়ে। চাপ দেয়ার পর বাসটি উল্টো ঘুরে আবার বগুড়ামুখী হয়ে আটকে যায়। এতে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ও ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই তিনজন এবং বগুড়া শহিদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে নেয়ার পথে ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়। এতে অন্তত ১৫ জন মারাত্মক আহত হয়েছেন, যাদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিহত সাতজন শ্রমিকেরই পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন-বগুড়া সদর উপজেলার ফাপোঁড় মধ্যপাড়ার বেল্লাল হোসেন (৪০), কাহালু উপজেলার নারহট্ট সরদার পাড়ার নুর মোহাম্মদ সরদার (৭৫), জয়পুরহাট জেলার কালাই থানার আনারুল ইসলাম (৫৫), পাঁচবিবি থানার আমিরুল (৪০), গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের আবু সাইদ (৪৫), একই উপজেলার নুর আলম (৪৫) এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার তাজিমুল (৪৭)। বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী জানান, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি উদ্ধার করে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। নিহতদের পরিচয় শনাক্তের পর তাদের দরিদ্র পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

একই সড়কে ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রাণ গেল স্বামী-স্ত্রীর:

এদিকে, বগুড়ার এরুলিয়া এলাকায় প্রথম দুর্ঘটনার শোক কাটতে না কাটতেই মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে একই সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন এক ব্যবসায়ী দম্পতি। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের সদর উপজেলার এরুলিয়া বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- বগুড়া সদর উপজেলার আটাপাড়া এলাকার মৃত মোসলেম উদ্দিন মোল্লার ছেলে স্বর্ণ ব্যবসায়ী বাবুল হাসান (৫০) এবং তার স্ত্রী জেসমিন বিবি (৪৫)। এ ঘটনায় তাদের সঙ্গে থাকা সাত বছর বয়সী নাতি জুলকার নাঈন আহত হলেও সে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যায়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্বর্ণ ব্যবসায়ী বাবুল হাসান তার স্ত্রী ও নাতিকে নিয়ে মোটরসাইকেলযোগে নওগাঁর দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে বিমানবন্দর এলাকায় পৌঁছালে নওগাঁর দিক থেকে ছেড়ে আসা একটি দ্রুতগামী প্রাইভেটকার হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাদের মোটরসাইকেলটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। প্রত্যক্ষদর্শী মিরাজুল মণ্ডল জানান, প্রাইভেটকারটি নিয়ন্ত্রণ হারালে মোটরসাইকেল নিয়ে বাবুল হাসান রাস্তার একেবারে বাম পাশে সরে গিয়ে নিজেদের বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। প্রাইভেটকারের জোর ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই বাবুল হাসান মারা যান। বগুড়া সদর থানার এসআই মোস্তাফিজুর রহমান ও ওসি ইব্রাহিম আলী জানান, ঘাতক প্রাইভেটকারটি পুলিশ জব্দ করলেও চালক কৌশলে পালিয়ে গেছে। তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান ও আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

সিলেটে দুই বাসের ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষ, শিশুসহ নিহত ৯:

শুক্রবার সকাল ৭টা থেকে ৭টা ১০ মিনিটের মধ্যে সিলেটের ওসমানীনগরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাশিকাপন এলাকায় ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। ঢাকাগামী ‘ইউনিক পরিবহন’ (ঢাকা মেট্রো-ব ১৫-২৫৬৩) ও সিলেটগামী ‘বেঙ্গল স্লিপার কোচ’ (ঢাকা মেট্রো-ব ১২-৫৯৮৭) নামের দুটি দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসের মধ্যে বিকট শব্দে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে ইউনিক পরিবহনের বাসটি রাস্তার পাশে খাদে উল্টে পড়ে দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে বাসের ভেতরে থাকা যাত্রীদের মধ্যে ঘটনাস্থলেই ৭ জন প্রাণ হারান। খবর পেয়ে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ, ওসমানীনগর থানা পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।

উদ্ধারকর্মীরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় ও সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ বছরের এক শিশু ও আরও এক যাত্রীর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে এই দুর্ঘটনায় মোট প্রাণহানি দাঁড়ায় ৯ জনে। ওসমানীনগর থানার ওসি (তদন্ত) জয়নাল আবেদীন জানান, নিহতদের সবাই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী ছিলেন। নিহতদের লাশ উদ্ধার করে শেরপুর হাইওয়ে থানা পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। দুর্ঘটনার কারণে কিছুক্ষণ বিঘ্ন ঘটে থাকলেও বর্তমানে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে স্বাভাবিক যানবাহন চলাচল করছে।

ঝিনাইদহে দুই ট্রাকের সংঘর্ষে কেবিনে আটকা পড়ে চালক নিহত:

এর আগে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়কের শৈলকুপা উপজেলার বড়দাহ মাদ্রাসা এলাকায় বালুবাহী ও ধানবোঝাই দুটি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে তুফান দাস (৩১) নামে এক ট্রাকচালক কেবিনের ভেতরে আটকা পড়ে নিহত হন এবং আরও দুইজন গুরুতর আহত হন। নিহত তুফান দাস সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়ী গ্রামের হরিপদ দাসের ছেলে। শৈলকুপা ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন অফিসার মহিউদ্দিন ও আরাপপুর হাইওয়ে থানার ওসি জাহানুর আলী জানান, নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। সড়ক থেকে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাক দুটি সরিয়ে নিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।