দুর্গাপুরে তদারকিহীনতায় ধুঁকছে ১৯টি ক্লিনিক
ক্লিনিক বন্ধ রেখে পান বিক্রি করেন সিএইচসিপি:
দুর্গাপুর প্রতিনিধি: রাজশাহীর দুর্গাপুরে ডাঙ্গাপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) রতন আলীর বিরুদ্ধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লিনিক বন্ধ রেখে আড়তে গিয়ে পান বিক্রির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি দায়িত্ব অবহেলা করে নিয়মিত ব্যক্তিগত ব্যবসায় সময় দেয়ায় স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় সরেজমিনে ডাঙ্গাপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ সময় দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা ওষুধ না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে খালি হাতে বাড়ি ফিরে যাচ্ছিলেন।
স্থানীয়রা জানান, এটি কোনো একদিনের ঘটনা নয়; প্রতিদিন সকালে ক্লিনিকে হাজিরা দিয়েই মোটরসাইকেলে পান নিয়ে আড়তের উদ্দেশে রওনা হন রতন আলী। এরপর বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে কোনো রকমে ক্লিনিকে এসে কিছুক্ষণের জন্য বসেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আছের আলী অভিযোগ করেন, চাকরির পাশাপাশি রতনের একাধিক পানের বরজ রয়েছে। ক্লিনিকের পাশেই তাঁর বাড়ি হওয়ায় তিনি কাউকে তোয়াক্কা করেন না। উপজেলার শেষ সীমানা ও প্রত্যন্ত গ্রাম হওয়ায় এখানে প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই। ফলে রতন নিজের খেয়ালখুশি মতো ক্লিনিক খোলেন এবং বন্ধ করেন।
রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জ্বর ও সর্দি নিয়ে ওই ক্লিনিকে আসেন এক বাক-প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। ক্লিনিকের প্রধান ফটক খোলা থাকলেও ভেতরের কক্ষগুলো তালাবদ্ধ দেখে তিনি দীর্ঘক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে স্থানীয় এক বাসিন্দা হাতের ইশারায় সিএইচসিপি ক্লিনিকে নেই জানালে, ওই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি চিকিৎসা না পেয়েই ফিরে যান।
ক্লিনিকের পাশেই পানের বরজে কর্মরত জামাল উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি জানান, এই ক্লিনিকের সিএইচসিপি রতন আলীর কাছে এলাকার রোগীরা জিম্মি। তিনি বলেন, গতকাল রোববার সকালে উনি ক্লিনিকে এসেছিলেন। কিন্তু একটু পরেই আবার তালা লাগিয়ে মোটরসাইকেলে করে পান নিয়ে আড়তে চলে যান। বেলা ১২টা বাজলেই তাঁকে আর পাওয়া যায় না। রোগী দেখার চেয়ে পারিবারিক কাজেই তিনি বেশি ব্যস্ত থাকেন। ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা জানান, এলাকাবাসীর সুবিধার্থে স্থানীয়রা চাঁদা (হারির টাকা) তুলে এই ক্লিনিকটি গড়ে তুলেছিলেন, কিন্তু প্রশাসনের তদারকি না থাকায় এর সুফল মিলছে না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিএইচসিপি রতন আলী বলেন, এখন ঈদের সিজন। আমি ব্যাংকে টাকা তুলতে যাচ্ছিলাম। সঙ্গে কিছু পানও নিয়ে যাচ্ছিলাম বিক্রির উদ্দেশে। এ জন্য ওপরের কর্মকর্তার অনুমতি নিয়েছিলাম। তবে প্রতিদিন ক্লিনিক বন্ধ রেখে পান বিক্রি করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, আমার ১৫ পোনের বড় পানের বরজ রয়েছে। চাকরির বাইরে তো আমি এগুলো দেখাশোনা করতেই পারি।
উপজেলায় ১৯টি ক্লিনিকেরই বেহাল দশা, চলছে ভুয়া রেজিস্টার খাতা: অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্গাপুর উপজেলায় প্রায় ৩ লাখ মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সাতটি ইউনিয়নে মোট ১৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে তদারকি না থাকায় অধিকাংশ ক্লিনিকই চলে সিএইচসিপিদের খামখেয়ালিতে। সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত সপ্তাহে ৬ দিন নির্দিষ্ট সময়ে ক্লিনিক খোলার নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। ক্লিনিকে সরকারিভাবে ২৬ ধরনের ওষুধ সরবরাহের কথা থাকলেও রোগীদের অভিযোগ জ্বর ও সর্দির বড়ি ছাড়া সেখানে আর কিছুই পাওয়া যায় না।
রোববার উপজেলার কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে দেখা যায়, ক্লিনিকগুলো খোলা থাকলেও কোনো রোগী নেই। অনেক ক্লিনিক দুপুর হতেই বন্ধ হয়ে যায়। অথচ ক্লিনিকে কোনো রোগী না থাকলেও মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে ৪০ থেকে ৪৪ জন রোগী দেখা হয়েছে বলে রেজিস্টার খাতায় লিপিবদ্ধ করছেন দায়িত্বরত সিএইচসিপিরা।
রোববার বেলা সাড়ে ১২টায় উপজেলার শ্যামপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, সিএইচসিপি ময়না খাতুন ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে একাই বসে আছেন। বাইরে কোনো রোগী ছিল না। সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পর তিনি গেট খোলেন। ময়না খাতুন দাবি করেন, গত ৫ মাস ধরে ক্লিনিকে কোনো ওষুধ ছিল না। গত ১০ মে সামান্য কিছু ওষুধ পেলেও কোনো অ্যান্টিবায়োটিক পাননি। তাই সামান্য ওষুধ দিয়েই কোনোমতে ক্লিনিক চালাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ওষুধ সংকট, অনিয়মিত সময়সূচি এবং সিএইচসিপিদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে সাধারণ মানুষ এখন আর এসব ক্লিনিকে আসতে চান না। গড়ে প্রতিটি ক্লিনিকে দৈনিক ১২-১৫ জনের বেশি রোগী আসে না। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখানোর জন্য সিএইচসিপিরা রেজিস্টার খাতায় প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬৫ জন ভুয়া রোগীর তালিকা তৈরি করেন। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসে প্রতিটি ক্লিনিক থেকে অন্তত ৮০০ রোগীর প্রতিবেদন জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই মাসিক টার্গেট পূরণের চাপের মুখেই সিএইচসিপিরা প্রতিদিন ভুয়া নামের তালিকা তৈরি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মেহেদী হাসান সোহাগ বলেন, সিএইচসিপি রতন আলীর বিরুদ্ধে সময়মতো ক্লিনিকে না আসার একাধিক মৌখিক অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রাজশাহী জেলার সিভিল সার্জন এসআইএম রাজিউল করিম বলেন, সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ রেখে ব্যক্তিগত ব্যবসা বা এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং আইন পরিপন্থী। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নেব।
সোনালী/ জগদীশ রবিদাস










