ঢাকা | এপ্রিল ২, ২০২৬ - ২:০৮ পূর্বাহ্ন

রাজশাহী অঞ্চলে জ্বালানি মজুতের ‘মহোৎসব’

  • আপডেট: Wednesday, April 1, 2026 - 11:06 pm

সঙ্কটে সক্রিয় কালোবাজারি:

জগদীশ রবিদাস: রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জেলাগুলোতে পেট্রল ও অকটেনের চলমান সঙ্কট এবং অস্থিরতাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মেতে উঠেছে অবৈধ জ্বালানি মজুতের ‘মহোৎসবে’।

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোরে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত করা জ্বালানি উদ্ধার করে চলেছে প্রশাসন। এসব হোতাদের জেলা-জরিমানা করার পরও জ্বালানি মজুতের লাগাম যেন কোনভাবেই টানা যাচ্ছে না।

একদিকে পাম্পগুলোতে তেলের জন্য সাধারণ মানুষের মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইন, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে সক্রিয় হয়ে উঠা শক্তিশালী কালোবাজারি চক্রের এমন তৎপরতায় বড় প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।

দেখা গেছে, ভোররাত থেকে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন তেলের পাম্পগুলোতে ভিড় করছেন মোটরসাইকেল ও যানবাহন চালকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে কাক্সিক্ষত তেল পাচ্ছেন না। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, পাম্পগুলোতে ‘সরবরাহ নেই’ অজুহাত দেয়া হলেও অসাধু চক্রগুলো ড্রাম ভরে তেল সরিয়ে ফেলছে। এই তেল পরবর্তীতে খুচরা বাজারে দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে বোতলজাত পেট্রল ও অকটেন চড়া দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে। জ্বালানি সঙ্কটে স্থবির হয়ে পড়েছে এসব অঞ্চলের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে দেখা দিয়েছে চরম বিঘ্ন। রাজশাহী শহরের এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘পাম্পে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়েও তেল পাইনি। অথচ মোড়ের বিভিন্ন দোকানে বোতলে করে ঠিকই বেশি দামে তেল বিক্রি করা হচ্ছে।’

এদিকে, অবৈধ মজুত রোধে রাজশাহীসহ সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে প্রশাসন তাদের তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জেল-জরিমানা ও অবৈধ তেল জব্দ করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের এই চেষ্টা সাগরের মধ্যে এক বিন্দু জলের মতো। দৃশ্যত বাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে না। অভিযানের সংবাদ পাওয়ার আগেই মজুতদাররা সতর্ক হয়ে যাচ্ছে, ফলে মূল হোতারা রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমন কৃত্রিম সঙ্কট এবং প্রশাসনের কার্যকর ফলাফলের অভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং কালোবাজারি সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে না দিলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষি খাতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত কয়েকদিনে জ্বালানি মজুতের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাজশাহীর তানোরে অবৈধভাবে বিক্রির সময় ১শ ৩৮ লিটার ডিজেল ও ৫ লিটার পেট্রল জব্দ করে সরকারি মূল্যে উপস্থিত গ্রাহকদের মধ্যে বিক্রি করে অবৈধভাবে তেল বিক্রেতাকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাঈমা খানের ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল বুধবার দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাঈমা খান তানোর পৌর এলাকার তালন্দ গ্রামে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে বাড়ির পার্শ্বে উচ্চ মূল্যে জ্বালানি তেল ডিজেল ও পেট্রল বিক্রির সময় তালন্দ গ্রামের ইদ্রিস আলীর পুত্র আমিনুল ইসলামকে (৪৫) ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

এর আগে শুক্রবার (২০ মার্চ) রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ পেট্রল মজুদ ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে ‘সততা ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। উপজেলার মোল্লাপাড়া বাজারে অভিযান পরিচালনা করেন শিবু দাস সুমিত, যিনি পুঠিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)। অভিযানে প্রায় ২৫০০ লিটারের বেশি পেট্রল জব্দ করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, জব্দ করা পেট্রল তাৎক্ষণিকভাবে সরকার নির্ধারিত দামে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হয়, যাতে কৃত্রিম সঙ্কট না তৈরি হয় এবং ভোক্তারা ন্যায্যমূল্যে জ্বালানি পেতে পারেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশও দেয়া হয়েছে।

একইভাবে গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় অবৈধভাবে মজুদ করা বিপুল পরিমাণ পেট্রল ও ডিজেল উদ্ধার করে পুলিশ। ভোরে উপজেলার ভবানীগঞ্জের দানগাছী এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে এসব তেল জব্দ করা হয়। পুলিশ জানায়, দানগাছী গ্রামের ময়েজ উদ্দিন মার্কেটের একটি দোকানে অভিযান চালানো হয়। ওই দোকানের মালিক ঝিকরা নামকান গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার (৪৫)। অভিযানে তার দোকান থেকে প্রায় ৪০০ লিটার পেট্রল ও ১০০ লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়, যা মোট ২৩টি জারকিনে সংরক্ষিত ছিল। সূত্র জানায়, আব্দুস সাত্তার দীর্ঘদিন ধরে কসমেটিক ব্যবসার আড়ালে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুদ ও বিক্রি করে আসছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় তেলের সঙ্কট থাকলেও তিনি অতিরিক্ত দামে সহজেই পেট্রল সরবরাহ করতেন। এতে সাধারণ ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন।

শুধু রাজশাহী নয়, এর আশপাশের বিভিন্ন জেলাগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে।

যেমন নওগাঁর মান্দা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুতের অভিযোগে মোবাইল কোর্টের অভিযানে ৩২৭ লিটার পেট্রল ও অকটেন জব্দ করা হয়। গত ৩০ মার্চ রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মান্দা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নাবিল নওরোজ বৈশাখ উপজেলার মৈনম ইউনিয়নের পানিশাইল শরির মোড় এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন।

এর দুইদিন আগে গত ২৮ মার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ‘তেল নেই’ লেখা ব্যানার টাঙিয়ে জ্বালানি বিক্রি বন্ধ রাখার অভিযোগে নয়ন ফিলিং স্টেশন নামে একটি পেট্রল পাম্পের মালিককে জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওইদিন সন্ধ্যায় উপজেলার পুখুরিয়া এলাকা নয়ন ফিলিং স্টেশনে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির আহমেদ রোবেলের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির আহমেদ রোবেল বলেন, পাম্পটিতে ‘তেল নেই’ ব্যানার ঝুলিয়ে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে মজুত যাচাই করলে দেখা যায়, সেখানে ২ হাজার ৪৮৯ লিটার পেট্রল এবং ১০ হাজার ৯৪১ লিটার ডিজেল মজুত রয়েছে। পরে তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি তেল বিক্রি শুরু করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ২০০৯-এর আওতায় পাম্পটিকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এর একদিন পরে গত ২৯ মার্চ পাবনার চাটমোহরেও অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির উদ্দেশে পাচারের সময় ১২ ব্যারেল জ্বালানি তেল জব্দ করে পুলিশ। ওইদিন সন্ধ্যায় উপজেলার গুনাইগাছা ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর বটতলা মোড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব তেল জব্দ করা হয়। এ সময় জড়িত থাকার অভিযোগে দুই ব্যবসায়ীকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী চাটমোহরের বিভিন্ন স্থানে কয়েকগুণ বেশি দামে তেল বিক্রি করছিলেন। বর্তমানে চাটমোহরের খোলা বাজারে প্রতি লিটার অকটেন ৩০০ টাকা, পেট্রল ২৫০ টাকা এবং ডিজেল ২০০ টাকা দরে গোপনে বিক্রি হচ্ছে। এই সঙ্কটের মধ্যে রোববার সন্ধ্যায় বাঘাবাড়ী এলাকা থেকে দুটি নসিমনযোগে বিপুল পরিমাণ তেল নিয়ে আসছিলেন চাটমোহর পৌর শহরের লিটন হোসেন ও নিমাইচড়া ইউনিয়নের মুকুল হোসেন।

এছাড়াও নাটোরের সিংড়া উপজেলায় অবৈধভাবে ১১ হাজার লিটার জ্বালানি তেল মজুত করায় এক ব্যবসায়ীকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। উপজেলার শেরকোল বাজারের মেসার্স আশা ট্রেডার্সের মালিককে এ জরিমানা করা হয় বলে নির্বাহী হাকিম ও সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল রিফাত জানিয়েছেন।

এদিকে অবৈধ মজুত রোধে রাজশাহীসহ সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে তৎপরতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে প্রশাসন। তেল পাচার ও দেশের অভ্যন্তরে মজুত ঠেকাতে রাজশাহীর পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল ডিপোতে গত ২৫ মার্চ থেকে তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

২৫ মার্চ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজশাহী রেলস্টেশন-সংলগ্ন শিরোইল কলোনির যমুনা অয়েল ডিপোর সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন রাজশাহী ব্যাটালিয়ন (১ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার।

বিজিবি অধিনায়ক রিয়াজ শাহরিয়ার সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দেয়, ফলে দেশের বাজারে এর দাম পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় কম। এই মূল্য ব্যবধানের কারণে পাচারের প্রবণতা তৈরি হয়। তবে এ ধরনের কার্যক্রম রোধে বিজিবি কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে। রাজশাহীতে সীমান্তের আট কিলোমিটারের ভেতরের এলাকায় বিজিবি সরাসরি নজরদারি করছে এবং এর বাইরে অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।

বিজিবি সূত্রে জানা যায়, সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারে ১৬টি বিওপি থেকে নিয়মিত অভিযান চলছে। এ পর্যন্ত ১৯২টি বিশেষ টহল, ২২৮টি ভ্রাম্যমাণ চেকপোস্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এ ছাড়া বেলপুকুর ও রাজাবাড়ি চেকপোস্টে প্রায় আড়াই হাজার যানবাহনে তল্লাশি চালানো হয়েছে। নৌপথে স্পিডবোট ব্যবহার করে ৪৮টি টহল পরিচালনা করা হয়েছে।