ঢাকা | মে ২৪, ২০২৬ - ১০:৪২ অপরাহ্ন

রাজশাহীর বাজারে মিশ্র চিত্র: সবজি ও মুরগিতে স্বস্তি থাকলেও মসলা-মাংসে চরম অস্বস্তি

  • আপডেট: Sunday, May 24, 2026 - 10:35 pm

জগদীশ রবিদাস: পবিত্র ঈদুল আজহা তথা কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে রাজশাহীর নিত্যপণ্যের বাজারে এক মিশ্র ও বৈচিত্র্যময় পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাধারণত ঈদের আগে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ার চেনা ছক ভেঙে এবার বাজারে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। একদিকে কোরবানিকে কেন্দ্র করে সরবরাহ বাড়ায় কাঁচামরিচ, আলু, পেঁয়াজসহ প্রায় সব ধরনের সবজি এবং ব্রয়লার ও দেশি মুরগির দাম বেশ খানিকটা কমে ক্রেতাদের মাঝে স্বস্তি এনে দিয়েছে।

তবে ঠিক উল্টো চিত্র মসলা ও মাংসের বাজারে। ঈদের অপরিহার্য অনুষঙ্গ জিরা, এলাচ, দারুচিনিসহ বিভিন্ন মসলা এবং গরু ও খাসির মাংসের চড়া দামে সাধারণ ও নিম্নআয়ের ক্রেতাদের মাঝে চরম অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের অন্যান্য প্রধান শহরের মতো রাজশাহীতেও কোরবানির মাংস রান্না ও সংরক্ষণের জন্য মসলার চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার সুযোগে এই ঊর্ধ্বগতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সাধারণ ক্রেতারা।

রোববার সকালে রাজশাহী শহরের সাহেববাজার, মাস্টার পাড়া বাজার, বউবাজার, বিনোদপুর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে বাজার পরিস্থিতির এমন তথ্য জানা গেছে।

সবজি ও মুরগির বাজারে বড় স্বস্তি, কমেছে দাম:

বাজারের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো সবজির দাম কমে যাওয়া। গত সপ্তাহের তুলনায় প্রতি কেজি সবজিতে গড়ে ১৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম কমেছে। বাজারে বর্তমানে ডায়মন্ড আলু বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২০ টাকায়। পেঁয়াজের দামও কেজিতে ৫ টাকা কমেছে। গত সপ্তাহে ৪০-৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ এখন মিলছে ৩৫-৪০ টাকায়। গত সপ্তাহে ১০০-১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া কাঁচামরিচ এখন নেমে এসেছে ৮০-৮৫ টাকায়। সবচেয়ে বেশি কমেছে শসার দাম; ৬০-৭০ টাকার শসা এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৫ টাকায়।

বাজারে বর্তমানে বরবটি ৩০ টাকা, পটল ৩৫ টাকা, বেগুন ৩৫-৪০ টাকা, কাকরোল ৩০ টাকা, চিচিঙ্গা ৩০-৩৫ টাকা, ফুলকপি ২০ টাকা, করলা ৪০ টাকা, পেঁপে ১৫-২০ টাকা, ঢেঁড়স ২৫-৩০ টাকা, লাউ ২৫-৩০ টাকা এবং মিষ্টিকুমড়া ৩০-৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ঝিঙের দাম কেজিতে ২০ টাকা কমে বর্তমানে ৪০ টাকায় ঠেকেছে। পুইশাক, পালংশাক, লালশাক ও ধনেপাতাসহ বিভিন্ন শাকের দামও ৫-১০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।

ডিম ও মুরগির বাজার:

ডিমের বাজারেও কিছুটা স্বস্তি এসেছে। সাদা ডিম প্রতি হালি ৩৫-৩৮ এবং লাল ডিম ৩৮-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, সামনে কোরবানির ঈদ থাকায় মুরগির বাজারে বড় পতন এসেছে। গত সপ্তাহে ১৭০-১৭৫ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া ব্রয়লার মুরগি এখন বিক্রি হচ্ছে ১৪০-১৪৫ টাকায়। সোনালি মুরগির দাম ২৭০ টাকা থেকে কমে ২৫০ টাকা, লেয়ার মুরগি ২০ টাকা কমে ৩৩০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৪৫০ টাকা থেকে কমে ৪৩০-৪৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হাঁসের দামও কমে কেজিতে ২২০-২৩৫ টাকায় নেমে এসেছে।

সবজির বাজার কমতির দিকে হলেও গাজর ও টমেটোর বাজারে উল্টো রথ। গত সপ্তাহে ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি হওয়া গাজর এখন লাফিয়ে ১৬০-১৮০ টাকায় পৌঁছেছে। কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়ে টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১১০-১২০ টাকায়। এছাড়া আদার দাম ১০-২০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ১৮০-১৯০ টাকা এবং রসুন ১৬০-১৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

মসলার বাজারে আগুন, আকাশচুম্বী এলাচের দাম:

কোরবানির মাংস রান্নার মূল অনুষঙ্গ মসলার বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। বাজারে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে ছোট এলাচের। এর দাম এখন আকাশচুম্বী, যা প্রতি কেজি ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকায় (মানভেদে ৪,৬০০ থেকে ৫,৫০০ টাকা) ঠেকেছে। এছাড়া কালো এলাচ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকা কেজি দরে।

বাজারে প্রতি কেজি জয়েত্রী ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, গোল কিচমিচ ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা, স্টার মসলা ১ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার টাকা এবং জাইফল ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া দারুচিনি ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা, ধনিয়া ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, শুকনো মরিচ ৩৮০ টাকা এবং মহরী ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে মসলার দাম কিছুটা বেড়েছে। অবশ্য গত বছরের তুলনায় জিরার দাম কিছুটা কমেছে (বর্তমানে কেজি ৬০০-৭০০ টাকা) এবং এলাচের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে বলে তারা জানান।

মাংসের বাজারেও চড়া দাম:

মসলার বাজারের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে মাংসের বাজারেও। বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকায়। অন্যদিকে খাসির মাংসের দাম সাধারণ মানুষের সম্পূর্ণ ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বাজারে প্রতি কেজি খাসির মাংস ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাহেববাজারের সবজি বিক্রেতা কামাল মণ্ডল ও বিনোদপুরের রকি ইসলাম জানান, বাজারে সবজির সরবরাহ বাড়ার কারণেই দাম ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। দাম কম থাকায় বিক্রিও ভালো হচ্ছে। রাবি স্টেশন বাজারের মুরগি বিক্রেতা হৃদয় আহমেদ বলেন, সামনে কোরবানির ঈদ থাকায় মুরগির চাহিদা কম, তাই দাম কমেছে। ঈদের আগে আরও কমতে পারে, তবে ঈদের পর আবার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সবজির দামে স্বস্তি প্রকাশ করে ক্রেতা সেলিনা রহমান বলেন, সবজির দাম কমায় কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। তবে মাস্টার পাড়া বাজারের সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে মসলা ও মাংসের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখনই যদি প্রশাসন থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তবে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ঈদের আনন্দ মাটি হয়ে যাবে। অবশ্য বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে এবং ঈদের আগে নতুন করে আর দাম বাড়ার সম্ভাবনা নেই।