মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল: রাজশাহী অঞ্চলে চিহ্নিত একশ’ ঝুঁকিপূর্ণ স্পট
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর আঞ্চলিক মহাসড়কগুলো যেন এখন একেকটি মৃত্যুফাঁদ। প্রতিদিনের মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। অপ্রশস্ত রাস্তা, বিপজ্জনক বাঁক, বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইনের বালাইহীন ছোট যানবাহনের অবাধ চলাচল এবং পর্যাপ্ত সিগন্যালের অনুপস্থিতি এই প্রাণহানির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই অঞ্চলের মহাসড়কগুলোতে অন্তত একশ’টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ স্পট বা হটস্পট শনাক্ত করা হয়েছে, যার বড় একটি অংশ জুড়েই রয়েছে রাজশাহী জেলা।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালে শুধু রাজশাহী বিভাগের জাতীয় মহাসড়কগুলোতে ৯৮০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই (জুন পর্যন্ত) ৪২০টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৭০ জন। নাটোরের বড়াইগ্রামের মর্মান্তিক দুর্ঘটনাগুলোর ক্ষত এখনো শুকায়নি; ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর এই বড়াইগ্রামেই সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৮ জনের প্রাণহানির ঠিক এক যুগ পর, অর্থাৎ ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর ফের বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে ১৪ জনের মৃত্যু হয়।
এছাড়া ২০২১ সালে নাটোর-রাজশাহী মহাসড়কের কাটাখালীতে বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৭ জন যাত্রীর জীবন্ত দগ্ধ হয়ে অঙ্গার হওয়ার ঘটনা গোটা দেশকে নাড়া দিয়েছিল। পুঠিয়ার ঝলমলিয়া বাজারেও বালুবাহী ট্রাক উল্টে চারজনের মৃত্যুর নজির রয়েছে।
সম্প্রতি পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল খুলনা-রাজশাহী ২৬৯ কিলোমিটার মহাসড়কের দুর্ঘটনা প্রবণতা বিশ্লেষণ করে একশ’টি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে বড়াইগ্রাম, দাশুড়িয়া, বনপাড়া, ঝলমলিয়া, পুঠিয়া ও কাটাখালী এলাকাগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে। শুধু রাজশাহী জেলাতেই বারবার দুর্ঘটনা ঘটে এমন হটস্পটের সংখ্যা ৪৩টি।
গবেষণা দলের সদস্য ও পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আশরাফুজ্জামান প্রামানিক জানান, অনেক স্থানে অপ্রশস্ত রাস্তার পাশেই রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কাঁচাবাজার। অথচ সেখানে প্রয়োজনীয় ট্রাফিক সাইন কিংবা রোড মার্কিং না থাকায় চালকরা গতিরোধ করতে পারেন না, যা ডেকে আনে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, হাটিকুমরুল ইন্টারসেকশন থেকে নাটোরের বনপাড়া পর্যন্ত ব্যস্ততম সড়কে যানবাহনের চাপ থাকলেও রাস্তা প্রশস্ত হয়নি; এই ৩১ কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে ২৫টি বিপজ্জনক বাঁক।
এছাড়া বনপাড়া থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত মহাসড়কে রয়েছে আরও ৫০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক। রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক, কাশিয়াডাঙ্গা, আমনুরা, খরখড়ি, বাগমারা ও পুঠিয়া-বাঘা সড়কে রয়েছে অন্তত ৪৬টি বাঁক। এসব বাঁকে প্রায়শই মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। অতিরিক্ত গতি, ড্রাইভিং জ্ঞানের ঘাটতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ক্লান্ত ও মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন যান এবং ধীরগতির তিন চাকার যানবাহনের বেপরোয়া চলাচলের কারণে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলন রাজশাহীর সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ মনে করেন, ব্যস্ততম এসব সড়কে দ্রুত ডিভাইডার নির্মাণ করা হলে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে আসত। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, সাব-রোড থেকে লাইসেন্সবিহীন সিএনজি ও ছোট যানবাহনগুলো কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে হঠাৎ মহাসড়কে উঠে পড়ায় মুহূর্তের মধ্যে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর রাজশাহী বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব জানান, সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, সংকীর্ণ সড়ক ও সাইন-সিগন্যালের ত্রুটি দূর করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া দুর্ঘটনার পর প্রাণহানি কমাতে ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু, জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতকরণ এবং ট্রাফিক পুলিশকে শক্তিশালী করতে বিশেষ যানবাহন সরবরাহের কাজ চলছে।











