রাজশাহীতে প্রাথমিকে প্রশাসনিক সংকট, বিঘ্নিত হচ্ছে পাঠদান
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীতে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও জেলার অর্ধেকেরও বেশি প্রতিষ্ঠানে তৈরি হয়েছে মারাত্মক প্রশাসনিক শূন্যতা। জেলার মোট ১ হাজার ৫৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৮৯টিতেই নেই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক।
ফলে জেলার ৫৬ শতাংশের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে স্থায়ী অভিভাবক ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দাপ্তরিক কার্যক্রম ও শ্রেণিকক্ষের নিয়মিত পাঠদানে।
রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের চলতি ২০২৬ সালের জুলাই মাসের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৫৭টি অনুমোদিত প্রধান শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৪৬৮ জন। সংকট সামাল দিতে এসব প্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত অথবা চলতি দায়িত্ব দিয়ে দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে এ সংকট কমার বদলে আরও ঘনীভূত হয়েছে। ২০২২ সালে যেখানে শূন্য পদের সংখ্যা ছিল ৪২০টি এবং ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৮৯টিতে, সেখানে ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে এসে সেই সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে ৫৮৯টিতে পৌঁছেছে।
উপজেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, রাজশাহীর গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতেই এ সংকট সবচেয়ে বেশি। শীর্ষে থাকা বাগমারা উপজেলায় ২২০টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ৭৫ জন, অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (১৪৫টি) পদই খালি।
এছাড়া গোদাগাড়ীতে ৮৯টি, তানোরে ৮৫টি, পুঠিয়ায় ৪৯টি, দুর্গাপুরে ৪৬টি, পবায় ৪৩টি, চারঘাটে ৪১টি, মোহনপুরে ৪০টি, বাঘায় ৩৯টি এবং বোয়ালিয়া থানা এলাকায় ১২টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। কেবল বাগমারা, গোদাগাড়ী ও তানোর—এই তিন উপজেলাতেই মোট শূন্য পদের অর্ধেকেরও বেশি (৩১৯টি) পুঞ্জীভূত রয়েছে।
সহকারী শিক্ষকরা জানান, প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজের বিশাল চাপ তাদের ওপর এসে পড়ছে। সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, অনলাইন তথ্য প্রেরণ, আর্থিক লেনদেন ও অভিভাবক সমাবেশের মতো কাজ সামলাতে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় কমে যাচ্ছে। বর্তমানে জেলার ১৫৭ জন সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। তবে পদটি স্থায়ী না হওয়ায় এবং পূর্ণ প্রশাসনিক ক্ষমতা না থাকায় জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন তারা।
পবা উপজেলার বাগসারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওদুদ ও বাগমারার হাটগাঙ্গোপাড়ার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাজমুল হক জানান, একজন সহকারী শিক্ষকের পক্ষে একই সাথে ক্লাস নেওয়া ও দাপ্তরিক কাজ সামলানো অত্যন্ত কঠিন। পূর্ণ ক্ষমতা না থাকায় প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে হিমশিম খেতে হয়। পবার মৌগাছি এলাকার সহকারী শিক্ষক আরাফাত রহমান মনে করেন, সংকট কাটাতে ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং ৫০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে দ্রত শূন্য পদগুলো পূরণ করা উচিত।
শিক্ষা দপ্তরের তথ্য মতে, নিয়ম অনুযায়ী ৮০ শতাংশ পদ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ পদ সরাসরি নিয়োগে পূরণের কথা। সেই হিসেবে ৮৪৪টি পদোন্নতিযোগ্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৭১ জন শিক্ষক। দীর্ঘদিনের মামলা ও আইনি জটিলতার কারণে পদোন্নতি আটকে থাকলেও সম্প্রতি শিক্ষকদের বিগত পাঁচ বছরের মূল্যায়ন (এসিআর) আহ্বান করা হয়েছে বলে জানান রাজশাহী জেলা সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি হারুন অর রশিদ।
সার্বিক বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম আনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, শূন্য পদের সর্বশেষ পরিস্থিতি ও চাহিদাপত্র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত পেলেই দ্রুত পদায়ন ও পদোন্নতির মাধ্যমে এই সংকট দূর করা সম্ভব হবে।
সোনালী/জগদীশ রবিদাস











