ঢাকা | অগাস্ট ১৪, ২০২৬ - ১১:৫৫ অপরাহ্ন

শিরোনাম

ফারাক্কার থাবায় শুকোচ্ছে পদ্মা: বিলুপ্তির পথে রাজশাহীর সুস্বাদু ইলিশ

  • আপডেট: Friday, August 14, 2026 - 10:19 pm

স্টাফ রিপোর্টার: পদ্মার বুকে একসময় রুপালি ইলিশের ঝাঁক আর দেশীয় মাছের কলতান থাকলেও, আজ তা কেবলই অতীত স্মৃতি। উজানের মরণবাঁধ ফারাক্কার প্রভাবে নাব্য হারানো পদ্মা নদী গ্রীষ্ম মৌসুমে ধুধু বালুচরে পরিণত হয়। পানির গভীরতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় রাজশাহীর ঐতিহাসিক ও স্বাদে-ঘ্রাণে অতুলনীয় ইলিশ আজ চরম অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। একই সঙ্গে নদীর পরিবেশ বদলে যাওয়ায় চরম প্রজনন ও আবাসস্থল সঙ্কটে পড়েছে দেশীয় প্রজাতির মাছও। গবেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, নাব্য সঙ্কটে প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় পদ্মার প্রায় ৬০ শতাংশ মৎস্য প্রজাতি এখন বিলুপ্তির চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

রাজশাহী জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পদ্মায় ইলিশের উপস্থিতি কতটা দ্রুত তলানিতে ঠেকছে তা আহরণের পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে জেলার গোদাগাড়ী, পবা, চারঘাট ও বাঘার মাত্র চার উপজেলায় সব মিলিয়ে ৫ দশমিক ৩৭ টন ইলিশ ধরা পড়েছে। অথচ ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও রাজশাহীতে ২৮ দশমিক ৫৫ টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছিল। এর পর থেকেই মূলত ইলিশ আহরণের সূচক নামতে শুরু করে এবং মাত্র আট বছরের ব্যবধানে তা আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়। বিভাগীয় পর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করলেও একই করুণ অবস্থা চোখে পড়ে।

রাজশাহী বিভাগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেখানে ৫০৭ টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছিল, পরের ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে ৭৩৫ টন এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭৪১ টনে উন্নীত হয়। তবে এরপর থেকে ধারাবাহিক পতন শুরু হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫৮১ টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬০০ টন ইলিশ আহরণ হলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪৯২ টনে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও পাওয়া না গেলেও মৎস্য কর্তারা আশঙ্কা করছেন, এবার আহরণের পরিমাণ আরও তলানিতে ঠেকবে।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড কনজারভেশন’-এর ২০২৩ সালের গবেষণায় ফারাক্কা বাঁধের ভয়াবহ প্রভাব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ১৯৮৪ সালের তুলনায় শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর আয়তন কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ, গভীরতা কমেছে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং প্রবাহ কমেছে ২৬ দশমিক ২ শতাংশ। একই সঙ্গে নদীতে মিষ্টি পানির সরবরাহ সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ইয়ামিন হোসাইন সাংবাদিকদের জানান, ইলিশ দ্রুতগামী ও উজানমুখী মাছ। প্রাক-পাকিস্তান আমলে বঙ্গোপসাগর থেকে পদ্মা হয়ে ভারতের ভাগলপুর পর্যন্ত ইলিশ অবাধে যাতায়াত করত এবং ডিম ছাড়ত। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর থেকে নাব্য ও গভীরতা কমে যাওয়ায় রাজশাহীর পদ্মায় ইলিশের পথরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।

মূলত নদীর উজানে ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগে অর্থাৎ ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত পদ্মায় প্রতি সেকেন্ডে পানির প্রবাহ ছিল ৯ হাজার ৩২ ঘনমিটার। বাঁধ চালুর পর থেকে অর্থাৎ ১৯৭৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই গড় প্রবাহ কমে দাঁড়ায় ৫ হাজার ১৪৬ ঘনমিটারে। গবেষকদের মতে, প্রজননের জন্য পানির গভীরতা ন্যূনতম ২০ থেকে ২৫ ফুট না হলে ইলিশ উজানে আসতে চায় না। এছাড়া কৃষিতে অপরিকল্পিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং নদী শাসনের নামে ড্রেজিংয়ের কারণে পানিতে বালুর পরিমাণ বেড়ে ঘোলাটে ভাব তৈরি হওয়াকেও ইলিশের আগমন হ্রাসের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পদ্মার এই পরিবেশ বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে দেশীয় প্রজাতির অন্য মাছও।

২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পদ্মার ৭৭টি দেশীয় প্রজাতির মাছের মধ্যে ৩টি মারাত্মক বিপন্ন, ১০টি বিপন্ন, ৯টি অতি বিপন্ন এবং ৯টি প্রজাতি বিপন্নপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে পদ্মায় ২ হাজার ২৮৩ টন দেশীয় মাছ আহরণ করা হয়েছিল। তবে ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ২২১ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ১৫২ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৪০ টন এবং সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৫০ টনে। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে কেবল পদ্মা নদী থেকেই দেশীয় মাছ আহরণ কমেছে ৪ ৩৩ টন।

পদ্মার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের জানান, পদ্মায় এখন ইলিশের পরিমাণ খুবই কম এবং যেটুকু পাওয়া যায় তাও আকারে ছোট। এছাড়া ট্যাংড়া বা পুঁটির মতো কিছু দেশি মাছ অল্প পাওয়া যাচ্ছে। অসাধু উপায়ে মাছ শিকার রোধে তাদের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সীমাবদ্ধ জনবল সত্ত্বেও নদী ও দেশীয় মাছ রক্ষায় বিশেষ করে ক্ষতিকর চায়না দুয়ারি জাল বন্ধে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।