ঢাকা | এপ্রিল ২৮, ২০২৬ - ১১:০৩ অপরাহ্ন

শিরোনাম

রূপপুরে জ্বালানি লোডিং শুরু: পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশ

  • আপডেট: Tuesday, April 28, 2026 - 9:51 pm

পাবনা প্রতিনিধি: অবশেষে সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফুয়েল বা জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হলো। এর মাধ্যমে পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করলো বাংলাদেশ। অর্জিত হলো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩ তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দেশ।

মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় এক অনাড়ম্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধন করেন অতিথিরা। এ সময় ডাক ও টেলি যোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ডাক ও টেলি যোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রোসাটম এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচভ। এছাড়া অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি। এর আগে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পর্কিত একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়।

অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা কিছুদিন যাবত এই পারমাণবিক প্রকল্পে কাজ করছিলাম। তিনি বলেছিলেন, সেফটি সিকিউরিটি রেখে যতদ্রুত সম্ভব এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প কমিশনিং করার জন্য। আজকে সেইদিন আমরা পেয়েছি। তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ফিজিক্যাল স্টার্টআপ থেকে আজকে আমাদের জ্বালানি লোডিং শুরু হলো। এটি একটি গৌরবোজ্জল অধ্যায়। বহু বছরের পরিকল্পনা, গবেষণা, দক্ষতা, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সফল পরিণতি দেখতে পাচ্ছি আজ। রাষ্ট্র যখন দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করে তখন এমন অর্জন সম্ভব হয়।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারণাটা ১৯৬৮ সালের, সে সময় হয়নি। স্বাধীনতা পূর্ব ও স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন পর্যায়ে প্রথমত যাচাইয়ের জন্য একাধিক সমীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। প্রতিটি সমীক্ষায় প্রতিটি কারিগরি অর্থনীতি এবং আর্থিক যৌক্তিকতা প্রতিমান হয়। তবে সে সময়ের আর্থিক প্রযুক্তিগত কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমীক্ষা পরিচালিত হয়, যা ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে।

পরবর্তীতে ৭ মে ১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পদ্ধতি বাস্তবায়ন কমিটি এই সভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয়, যা বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচিতে নতুন গতিপথ প্রদান করে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও অর্থনীতির যে দর্শন সামনে নিয়ে এসেছিলেন তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই পারমাণবিক প্রযুক্তির বিকাশ। আর তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশে পারমাণবিক গবেষণার ভিত্তি সূচিত হয় এবং গবেষণার রিয়াক্টর স্থাপনের মাধ্যমে আমাদের পারমাণবিক যাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত তৈরি হয়।

তিনি বলেন, আজ এই রূপপুর সেই স্বপ্নের এক মহিমান্বিত বাস্তব রূপ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনি ইশতেহারেও বিজ্ঞান প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হয়েছে; এটি তারই একটি শক্তিশালী প্রতিফলন। একটি আত্মনির্ভরশীল প্রযুক্তি নির্ভরশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের যে স্বপ্ন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেখিয়ে গেছেন আজ আমরা সেই পথেই এগিয়ে চলেছি। এ প্রকল্পে ভিভিইআর ১২০০ রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে, যার উৎপাদন ক্ষমতা ২৪০০ মেগাওয়াট। এটা বিশ্বের অত্যাধুনিক জেনারেশন থ্রি জি প্রজেক্ট।

সর্বোচ্চ নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও দক্ষতার সমন্বয়ে এই কেন্দ্র বাংলাদেশের চলমান জীবনমান উন্নত করবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা, এটি নিশ্চিত করেছে। পারমাণবিক শক্তিতে আত্মবিশ্বাস জরুরি কিন্তু আত্মতুষ্টি বা বর্জন নয়। তাই আমরা নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত আত্মবিশ্বাসের একটি প্রতীক। আমি বিশ্বাস করি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এই প্রকল্প।

ডাক ও টেলি যোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, মঙ্গলবার বাংলাদেশের জন্য গৌরবময় ও তাৎপর্যময় দিন। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে ফুয়েল লোডিং কেবলমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক অগ্রগতি নয়, একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দেশীয় সক্ষতমতার বাস্তব প্রতিফলন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আমাদের জাতীয় সক্ষমতার প্রতীক।

রোসাটম এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশকে যেভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও সেভাবে পাশে থাকবে। বাংলাদেশের মানুষকে আশ্বস্ত করতে চাই নিরাপত্তা নিয়ে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সর্বোচ্চ মানদণ্ড বজায় রাখা হয়েছে। নিরাপদ পারমাণবিক কেন্দ্র থেকেই সরবরাহ করা হবে বিদ্যুৎ। এমনকি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যতের প্রয়োজনে সহযোগিতা থাকবে রোসাটমের। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানি লোডিং করতে সময় লাগবে ৪০ থেকে ৪৫ দিন। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে এ প্রকল্প থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। শুরুর দিকে প্রথম ইউনিট থেকে প্রথম অবস্থায় অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।

এর আগে গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) প্রথম ইউনিটের জন্য কমিশনিং লাইসেন্স প্রদান করে। এর মাধ্যমেই জ্বালানি লোডিংয়ের পথ প্রশস্ত হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য অনুমোদনপ্রাপ্ত নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান জানান, কেন্দ্র পরিচালনার জন্য ৫২ জন বিশেষজ্ঞ সফলভাবে লাইসেন্স অর্জন করেছেন। এই ৫২ জন লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ এবং রাশিয়ার লাইসেন্সধারী অপারেটরদের সমন্বয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালিত হবে।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, প্রতি মাসে ১০-১৫ শতাংশ করে উৎপাদন বাড়তে থাকবে। ফিজিক্যাল স্টার্টআপের পর পূর্ণ ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগতে পারে প্রায় ৮ থেকে ১০ মাস। এ বছরের শেষের দিকে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটে ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।

প্রসঙ্গত, পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পে রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নেয়া হয়েছে। এখানে দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে। দুটি ইউনিট পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এখান থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশেরও বেশি পূরণ করবে।