ঢাকা | অক্টোবর ১২, ২০২৬ - ১২:৪৯ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

শারদীয় উৎসবে ঐতিহ্যবাহী রেশমপণ্যে আভিজাত্যের স্পর্শ

  • আপডেট: Sunday, October 11, 2026 - 10:27 pm

স্টাফ রিপোর্টার: শারদীয় দুর্গাপূজার আবহ ও ক্রেতাদের ভিড়ে জমজমাট হয়ে উঠেছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিল্কের বাজার। ধূপের সুবাস আর ঢাকের কাঠির বাজনার সঙ্গে উৎসবের কেনাকাটায় ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের নিখুঁত মেলবন্ধনে ক্রেতাদের প্রধান পছন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে রেশমপণ্য।

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরের তুলনায় এবার পূজা ঘিরে সিল্কের পোশাকের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নকশার বৈচিত্র্য, পরতে আরামদায়ক অভিজ্ঞতা এবং উৎসবের পোশাকে আলাদা আভিজাত্যের কারণেই সিল্ক শোরুমগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন সর্বস্তরের মানুষ। এবারের বেচাকেনায় চাহিদার শীর্ষে রয়েছে সিল্কের থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবি, যার পরপরই অবস্থান করছে নান্দনিক সিল্কের শাড়ি।

নগরীর সপুরা সিল্ক, উষা সিল্ক এবং সরকারি রেশম কারখানার শোরুমসহ বিভিন্ন সিল্ক হাউসে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে কেনাকাটার উৎসব। শুধু স্থানীয় ক্রেতাই নন, রাজশাহী ও আশেপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে ছুটে আসছেন উৎসবপ্রেমী মানুষ। বগুড়া থেকে রাজশাহীর সপুরা সিল্কের শোরুমে কেনাকাটা করতে এসেছেন কলেজশিক্ষক মনিকা কবিরাজ। তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছেলে ও স্বজনরা।

নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি জানান, পূজায় সিল্ক ছাড়া তাঁর চলেই না এবং গত পূজায় তিনটি শাড়ি কিনলেও এবার নিজের জন্য শাড়ি, বোন ও মাসির জন্য বিশেষ উপহার এবং ছেলের জন্য সিল্কের পাঞ্জাবি কিনবেন। পছন্দ হলে বাজেট সমন্বয় করে নেওয়া যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন যে উৎসবের আনন্দের কাছে বাজেট কোনো বিষয় নয়। অন্যদিকে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এলিনা তাসনীম বন্ধুদের নিয়ে এসেছেন পছন্দের সিল্কের শাড়ি কিনতে।

তিনি জানান, সিল্কের শাড়ি পরে চলাফেরা করা খুব আরামদায়ক এবং রঙের বৈচিত্র্য ও নকশার প্রচুর পছন্দ পাওয়ায় শাড়িকেই তিনি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এমনকি দূর টাঙ্গাইল থেকে রাজশাহীতে বেড়াতে এসে রেশমের টানে শোরুমে এসেছেন তারিন তাসনীম নামের এক তরুণী, যিনি সিল্কের শাড়ি, স্কার্ফ ও সালোয়ার-কামিজ ঘুরে দেখার পর ইতোমধ্যে একটি স্কার্ফ কিনে শাড়ি পছন্দ করছিলেন।

উৎসবের বাজারে কাপড়ে নতুনত্ব আনতে ‘র’ সিল্ক ও মসলিন থানকাপড়ের ওপর যুক্ত করা হচ্ছে হাতের কাজ, ব্লকপ্রিন্ট, এমব্রয়ডারি ও জামদানি নকশা। সপুরা সিল্ক মিলসের পরিচালক সাজ্জাদ আলী সাংবাদিকদের জানান, সিল্কের মসলিন থানকাপড়ের উৎপাদন সর্বোচ্চ বাড়িয়েও চাহিদা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।

বর্তমানে রেশমের থানকাপড়ের ওপর নিখুঁত হাতের কাজ করছেন প্রায় সাতশ নারী কর্মী। তাছাড়া একশ্রেণির তরুণ-তরুণী উদ্যোক্তারা এসব থানকাপড় কিনে আধুনিক নকশার কারুকাজ যুক্ত করে অনলাইনে বিক্রি করছেন, যা সিল্ক পণ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

অনলাইন পেজ পরিচালনকারী সাধুর মোড় এলাকার তরুণ উদ্যোক্তা তানিয়া শারমিনের মতো অনেকে এখন সিল্কের সহজলভ্যতা কাজে লাগিয়ে হাতের আঁকা শাড়ি ও আধুনিক নকশার পোশাক পৌঁছে দিচ্ছেন সারাদেশে।

রাজশাহী সরকারি রেশম কারখানার সামনের বিক্রয়কেন্দ্রেও দেখা গেছে ভিড়। গরদ শাড়ি, স্ট্রাইপ সুপার বলাকা, ধুপিয়ান সার্টিন, থানকাপড়, টু-পিস, ওড়না থেকে শুরু করে হিজাব ও টাই মিলছে এখানে। অনুষ্ঠানে পরার উপযোগী ধুপিয়ান সিল্কের একটু ভারী কাপড়ের পাঞ্জাবির চাহিদা এবার আকাশচুম্বী।

সিরাজগঞ্জ থেকে আসা এক সরকারি কর্মকর্তা তাঁর সহকর্মীদের জন্য একসঙ্গেই কিনেছেন সাড়ে দশ হাজার টাকা দামের দশটি ধুপিয়ান সিল্কের পাঞ্জাবি। উষা সিল্কের মহাব্যবস্থাপক জহুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, শারদীয় দুর্গাপূজা কেন্দ্র করে এবার শোরুমগুলোতে থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি ও শাড়ির ভালো চাপ রয়েছে এবং সামনের দিনগুলোতে বেচাকেনা আরও বাড়বে বলে তাঁরা আশা করছেন।

নকশা, কাপড়ের ধরন ও হাতের কাজের সূক্ষ্মতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হচ্ছে রেশমপণ্যের দাম। বাজারে সফট সিল্কের শাড়ি তিন হাজার থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা, এন্ডি সিল্কের শাড়ি তিন হাজার আটশ পঞ্চাশ থেকে সাত হাজার নয়শ পঞ্চাশ টাকা এবং ‘র’ সিল্কের হ্যান্ডপ্রিন্ট শাড়ি তিন হাজার পাঁচশ পঞ্চাশ থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এছাড়াও এমব্রয়ডারি করা মসলিন সিল্কের দাম সাড়ে নয় হাজার থেকে সাড়ে বত্রিশ হাজার টাকা, বলাকা সিল্কের শাড়ি দুই হাজার থেকে আট হাজার টাকা, ভেজিটেবল ডাই সিল্ক চার হাজার সাতশ থেকে ১৩ হাজার আটশ টাকা এবং মটকা সিল্ক পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু হচ্ছে। থ্রি-পিসের ক্ষেত্রে সফট ও ‘র’ সিল্কের থ্রি-পিস ছয় হাজার পঞ্চাশ থেকে সাড়ে বত্রিশ হাজার টাকা, শার্ট দুই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা এবং পাঞ্জাবি সাড়ে ছয় হাজার থেকে বাইশ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

থানকাপড়ের বাজারে ‘র’ সিল্ক মসলিন প্রতি গজ সাড়ে চারশ টাকা, বলাকা থান এক হাজার পঞ্চাশ টাকা এবং ধুপিয়ান থান এক হাজার দুশ পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উৎসবের আবহ যত ঘনাচ্ছে, রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিল্কের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের কোলাহল আর রেশমের মেলা ততই জমজমাট হয়ে উঠছে।

সোনালী/জগদীশ রবিদাস