চার হাজার মানুষের গ্রামে ৫০ শয্যার হাসপাতাল দাবি, দুর্গাপুরে তোলপাড়
মিজান মাহী, দুর্গাপুর থেকে: রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের বসবাস। গ্রামীণ জনপদের স্বাস্থ্যসেবায় এই উপজেলায় ১৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং উপজেলা সদরে ৫০ শয্যার একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। সম্প্রতি সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিই ১০০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার কথা। তবে এর মাঝেই মাত্র ৪ হাজার মানুষের গ্রাম দাওকান্দির বাসিন্দারাও সেখানে পৃথক একটি ৫০ শয্যার হাসপাতাল দাবি করেছেন। এই দাবিতে গ্রামের প্রায় দেড় হাজার মানুষের স্বাক্ষরিত একটি লিখিত আবেদন স্থানীয় সংসদ সদস্য, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা সিভিল সার্জন বরাবর পাঠানো হয়েছে। আর এ নিয়েই এখন উপজেলাজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, উপজেলার সীমান্তবর্তী একটি প্রত্যন্ত গ্রামের নাম দাওকান্দি। উপজেলা সদর থেকে এই গ্রামটির দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। এর আগে ২০১৯ সালে তৎকালীন সরকারের আমলে দুর্গাপুর উপজেলা সদরের কোনো কলেজ সরকারি না করে, ২০ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দাওকান্দি কলেজকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রূপান্তরিত করা হয়। সে সময় উপজেলা সদরে কোনো কলেজ সরকারি না করায় সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষার্থীসহ সাধারণ জনগণ তীব্র আন্দোলন করেছিলেন। সেই দাওকান্দি গ্রামবাসীই এবার গ্রামে ৫০ শয্যার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবি তুললেন।
লিখিত আবেদন ও স্থানীয় এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দাওকান্দি গ্রামে মাত্র ৪ হাজার মানুষের বসবাস এবং ভোটার সংখ্যা ১৯০০-এর মতো। কিন্তু এই গ্রামের আশপাশের এলাকার প্রায় ১ লাখ মানুষ নানাভাবে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। দাওকান্দিসহ আশপাশের গ্রামগুলো একেবারে নিভৃত পল্লিতে হওয়ায় সেখানে ভালো চিকিৎসার কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দাওকান্দি গ্রাম থেকে দুর্গাপুর উপজেলা সদরের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার, মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১৫ কিলোমিটার, বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ২৫ কিলোমিটার এবং জেলা শহরের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। ফলে জরুরি মুহূর্তে কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চরম বিপাকে পড়তে হয় এবং পথেই অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে।
জয়নগর ইউনিয়নের ৭ নম্বর দাওকান্দি ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক বাবু বলেন, ভোটের সময় এমপি সাহেব আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এই গ্রামে একটি হাসপাতাল করে দেবেন। তাই গ্রামবাসী ও আশপাশের প্রায় দেড় হাজার লোকের স্বাক্ষর নিয়ে আমরা স্থানীয় সাংসদ, মন্ত্রণালয় ও সিভিল সার্জন বরাবর আবেদন করেছি। এমপি মহোদয়ের এ বিষয়ে সুনজর আছে। তিনি এ ব্যাপারে জোর তদবির চালাবেন এবং সংসদে কথা বলবেন বলে আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দাওকান্দি গ্রামের বাসিন্দা জয়নুল আবেদীন বলেন, এই গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের মানুষগুলোর জন্য একটি হাসপাতাল অতিব জরুরি। কোনো বিপদ ঘটলে গ্রাম্য ডাক্তারই একমাত্র ভরসা, কাছাকাছি ভালো কোনো ডাক্তার নেই। নয়তো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শহর বা উপজেলা সদরে রোগী নিয়ে যেতে হয়। এতে অনেক সময় পথেই বড় ক্ষতি হয়ে যায়।
এদিকে প্রত্যন্ত গ্রামে নতুন করে ৫০ শয্যার হাসপাতালের আবেদনের বিষয়টি উপজেলাজুড়ে এখন প্রধান আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দুর্গাপুর উপজেলা সদরের এক কলেজ শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকার প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে এবং সেই নিয়ম অনুযায়ী শয্যা উপজেলা সদরেই বাড়াতে হবে। উপজেলা সদর থেকে সুবিধা কেটে প্রত্যন্ত গ্রামে নেয়া হলে সাধারণ জনগণ তা মেনে নেবে না।
এ বিষয়ে রাজশাহী-৫ (দুর্গাপুর-পুঠিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, দাওকান্দি গ্রামবাসীর স্বাক্ষরিত একটি আবেদনপত্র আমি পেয়েছি। এই দাবিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় সংসদে আমি কথা বলবো। এছাড়া রাজশাহীর সিভিল সার্জনের সঙ্গে ইতিমধ্যে আমার কথাও হয়েছে। সবাই বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
দাওকান্দি গ্রামে ৫০ শয্যার হাসপাতাল করা আসলেই সম্ভব কি না-জানতে চাইলে সংসদ সদস্য আরও বলেন, সেটা (৫০ শয্যা) হয়তোবা সম্ভব না। তবে ২০ শয্যার একটি হাসপাতালের জন্য জোরালো তদবির করা হবে। আশা করি, সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।











