ঢাকা | জুন ১৩, ২০২৬ - ২:২৪ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

পদ্মার তীব্র ভাঙন: ঝুঁকিতে ফসলি জমি ও স্কুল-মসজিদ, নামমাত্র প্রকল্প নিয়ে ক্ষোভ

  • আপডেট: Friday, June 12, 2026 - 11:30 pm

স্টাফ রিপোর্টার: বর্ষা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই রাজশাহীর চারঘাটে পদ্মা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। উপজেলার গোপালপুর, চন্দনশহর, পিরোজপুর ও সাহাপুর এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হতে শুরু করেছে।

ভাঙনের মুখে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং শত শত পরিবারের বসতভিটা। এমন পরিস্থিতিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মাত্র ১০০ মিটার এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নেয়ায় স্থানীয়দের মনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাইলের পর মাইল বিস্তৃত ভাঙনপ্রবণ এলাকার তুলনায় এই নামমাত্র বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চারঘাট উপজেলার পদ্মা নদীতীরবর্তী প্রায় আট কিলোমিটার এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধ থাকলেও প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা এখনো সম্পূর্ণ অরক্ষিত। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই এসব এলাকায় নদীভাঙন শুরু হয়। তখন জরুরি তহবিলের নামে সাময়িক ও অস্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্পের কোনো বাস্তব অগ্রগতি চোখে পড়ে না। চলতি বছরও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে গোপালপুর ও পিরোজপুর এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কয়েকশ বিঘা ফসলি জমির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।

জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড বিশেষ তহবিল থেকে প্রায় ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০০ মিটার এলাকায় মাত্র ৯ হাজার ২০০টি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করেছে। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, এই সামান্য উদ্যোগ স্থায়ী কোনো সুফল আনবে না। গোপালপুর গ্রামের কৃষক বাদশা ইসলাম বলেন, নদীর তীরে আমার ছয় বিঘা জমিতে পাট আবাদ করা ছিল। এরই মধ্যে দেড় বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। শুধু আমার নয়, এই এলাকার অধিকাংশ কৃষকের একই অবস্থা। গত বছরও লাখ লাখ টাকা খরচ করে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল, কিন্তু এবার আবারও ভাঙন শুরু হয়েছে।

পিরোজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূর উদ্দিন শেখ বলেন, যেখানে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে, তার মধ্যে আমাদের বিদ্যালয়টি পড়েনি। স্কুল থেকে নদীর দূরত্ব এখন মাত্র পাঁচ থেকে দশ মিটার। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো মুহূর্তে বিদ্যালয়টি নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে আপৎকালীন জরুরি প্রকল্পের নামে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও শুকনো মৌসুমে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ বা নদীশাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয় না। ফলে একই এলাকায় বারবার সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেয়া হলেও সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ব্যবহৃত প্রতিটি জিও ব্যাগে ২৫০ কেজি বালু থাকার কথা থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক বস্তায় নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম বালু রয়েছে। এ ছাড়া ভারত সীমান্তসংলগ্ন চরাঞ্চল থেকে মাটিমিশ্রিত বালু সংগ্রহ করে বস্তা ভর্তি করার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা তাজমুল হক বলেন, নদীর চর থেকে কেটে আনা বালুর সঙ্গে প্রচুর মাটি মিশে আছে। আবার সব বস্তায় সমান পরিমাণ ওজনও দেয়া হচ্ছে না। এমন নিম্নমানের কাজ দিয়ে নদীর এই তীব্র ভাঙন রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) চারঘাট উপজেলা শাখার সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, পদ্মার প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা বর্তমানে চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পুরো এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন না করলে প্রতিবছর একই সমস্যা ফিরে আসবে এবং সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হবে।

অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খাজা তারেক এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি মিজানুর রহমান বলেন, প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত কারিগরি মান অনুসরণ করেই করা হচ্ছে। বালুর মান ও বস্তার ওজন নিয়ে কোনো অনিয়ম বা লুকোচুরি করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) রাজশাহী পওর বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবু রৌশন মাস্উদ বলেন, স্থানীয়দের জরুরি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত ১০০ মিটার এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। তবে আশপাশের আরও অনেক এলাকা ঝুঁকিতে থাকার বিষয়টি সত্য। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি বর্তমানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় রয়েছে।

এ বিষয়ে চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, নদীভাঙনের সার্বিক পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। এছাড়া চলমান প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।