ঢাকা | মে ১৩, ২০২৬ - ৩:০৩ পূর্বাহ্ন

অবশেষে খনন হচ্ছে ঐতিহাসিক রক্তদহ বিল, কৃষকের মুখে হাসি

  • আপডেট: Monday, May 11, 2026 - 10:11 pm

এসএম সাইফুল ইসলাম, রাণীনগর (নওগাঁ) থেকে: নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক সম্পদে ভরা এক অনন্য নিদর্শনের নাম রক্তদহ বিল। প্রায় ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিলের অধিকাংশ অংশ রাণীনগর উপজেলায় এবং অবশিষ্ট অংশ বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় অবস্থিত। এক সময়কার প্রমত্তা এই বিলটি দীর্ঘকাল সংস্কার ও খননের অভাবে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। তবে সম্প্রতি এই বিল ও এর সাথে সংযুক্ত খালগুলো পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়ায় আশার আলো দেখছেন বিলপাড়ের হাজারো মানুষ।

ইতিহাসবিদদের মতে, ১৭ শতাব্দীর শেষের দিকে ফকির মজনু শাহ এই অঞ্চলে ব্রিটিশ ও তাদের সহযোগী অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১৭৮৬ সালে এই জনপদে অস্ত্রধারী সন্ন্যাসী ও ফকিরদের নিয়ে মজনু শাহের আগমনে আতঙ্কিত হয়ে জমিদার শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী পালিয়ে ময়মনসিংহে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশ বাহিনীর লেফটেন্যান্ট আইনস্টাইনের নেতৃত্বে এক বিশাল বাহিনীর সঙ্গে মজনু শাহের বাহিনীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাধে। সেই যুদ্ধে অসংখ্য মানুষের রক্তে বিলের পানি লাল হয়ে গিয়েছিল বলে এর নামকরণ করা হয় ‘রক্তদহ বিল’।

প্রাকৃতিক মৎস্য ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এই বিলে দেশি প্রজাতির মাছের অভয়াশ্রম রয়েছে। কিন্তু খনন না করায় বিলটি ভরাট হয়ে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে হারিয়ে গেছে বিলের উজানে থাকা প্রায় ২২টি খাল। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) সূত্রে জানা গেছে, বিল ও খালগুলো খননের জন্য একটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।

এটি বাস্তবায়িত হলে- বছরে প্রায় ১৮৯ কোটি টাকার অতিরিক্ত ধান উৎপাদন হবে। ৩৪০ একর এক-ফসলি জমি তিন-ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হবে। খালের গভীরতা ১২ ফুট বৃদ্ধি পাওয়ায় পানির ধারণক্ষমতা বাড়বে এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর রিচার্জ হবে। সেচ সুবিধা বাড়ায় অতিরিক্ত ৬৫ হাজার মেট্রিক টন ধান এবং প্রচুর পরিমাণে রবি শস্য উৎপাদন সম্ভব হবে।

বিলপাড়ের কৃষক মোস্তফা জানান, দখল ও দূষণে খালগুলো মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। পুনরায় খনন করা হলে এলাকার কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, নওগাঁর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম জানান, প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বগুড়া-৩ ও নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্যরা যৌথভাবে এটি বাস্তবায়নে কাজ করছেন। এটি রাণীনগর ও আদমদীঘির প্রায় ৪০টি গ্রামের মানুষের ভাগ্য বদলে দেবে।

নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য এস এম রেজাউল ইসলাম জানান, নির্বাচনের পর আমি নিজে বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে প্রস্তাবনা তৈরির নির্দেশনা দিয়েছিলাম। এটি বাস্তবায়নে তিনটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় প্রয়োজন। বিল ও খালের পাড়ে ইকো পার্ক, বৃক্ষরোপণ, মৎস্য অভয়াশ্রম এবং পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এলাকার অর্থনীতি ও পরিবেশের আমূল পরিবর্তন ঘটবে।