সময়সীমা ও দরপতনের চাপে রাজশাহী অঞ্চলের আলুচাষিরা
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী অঞ্চলে আর মাত্র মাসখানেকের মধ্যে নতুন আগাম আলু বাজারে উঠতে শুরু করবে। তবে এখনও পর্যন্ত এলাকার হিমাগারগুলোতে বিগত মৌসুমের সংরক্ষিত আলুর প্রায় অর্ধেক অবিক্রীত থেকে গেছে। সময়সীমার বাধ্যবাধকতা এবং বাজারমূল্য উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় চাষি ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষই চরম অর্থনৈতিক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন।
কৃষি ও হিমাগার ব্যবস্থাপনা সূত্রে জানা গেছে, পরবর্তী মৌসুমের আলু সংরক্ষণের জন্য হিমাগারগুলো প্রস্তুত করতে প্রতি বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এজন্য হিমাগার মালিকরা আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সংরক্ষিত আলু খালাসের তাগিদ দিয়েছেন। তবে আলুর বাজার পরিস্থিতি ও চাষিদের দূরাবস্থা বিবেচনা করে ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত সময় কিছুটা বৃদ্ধি করা হতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আলু না তুললে বকেয়া ভাড়া আদায়ে মাইকিং কিংবা নিলাম প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বর্তমানে রাজশাহী অঞ্চলের পাইকারি বাজারে আলুর দাম অবস্থান করছে প্রতি কেজি ১২ থেকে ১৪ টাকায়, এবং খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা দরে।
বিপরীতে, উৎপাদন, পরিবহন এবং হিমাগার ভাড়াসহ প্রতি কেজি আলুতে সার্বিক খরচ দাঁড়িয়েছে ২২ থেকে ২৫ টাকা। ফলে প্রতি কেজিতে গড়ে প্রায় ১১ টাকা করে লোকসান গুণতে হচ্ছে চাষি ও ব্যবসায়ীদের। রাজশাহী জেলার ৩৬টি হিমাগারে মোট ৮০ লাখ বস্তায় প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে অর্ধেকের মতো খালাস করা হলেও বাকি আলুর এক-তৃতীয়াংশ বীজ আলু হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। ফলশ্রুতিতে এখনও প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন বাণিজ্যিক আলু অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এক মাসের স্বল্প সময়ের মধ্যে এত বিপুল পরিমাণ আলু কীভাবে বিক্রি করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
মোহনপুর উপজেলার বসন্তকেদার গ্রামের আলুচাষি শেখ মবিনুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, তিনি পবা উপজেলার উত্তরা স্টোরে ২৫০ বস্তা আলু রেখেছিলেন। প্রতি কেজি আলু উৎপাদন ও হিমাগারে নেয়া পর্যন্ত প্রতি কেজিতে খরচ হয়েছিল ২২ থেকে ২৫ টাকা। এখন পাইকারি বাজারে প্রতি কেজির দাম ১২ থেকে ১৪ টাকা। গড়ে কেজিতে লোকসান ১১ টাকা। এই দরে আলু বেচে হিমাগার ভাড়া মেটানো যাচ্ছে না। শেখ মবিন আরও বলেন, আমার মতো হাজার হাজার আলু চাষির সামনে এমন উভয় সংকট। আলু ছাড়ালেও বিপদ আবার হিমাগারে রাখলেও বিপদ। না তুললে হিমাগার মালিক নিলামে বেচে ভাড়া উসুল করবেন।
রাজশাহীর হিমাগার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ৩০ নভেম্বর সময় পর্যন্ত আলু রাখার নিয়ম। কিন্তু আলুর বাজার পরিস্থিতি ও চাষিদের দূরাবস্থার কথা ভেবে হয়তো আরও কিছুদিন রাখতে হবে। তবে ডিসেম্বরের মধ্যে হিমাগার খালি করতে হবে। গত বছর হিমাগারের পক্ষ থেকে আলু খালাস করার জন্য মাইকিং করা হয়েছিল। পরিস্থিতি তেমন হলে এবারও নোটিশ দিয়ে পরে মাইকিং করা হবে।
রাজশাহীর বায়া এলাকার আলু ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, খুব বেশি হলে আর এক মাস সময় পাওয়া যাবে আলু হিমাগার থেকে তোলার জন্য। কিন্তু মাত্র এক মাসের মধ্যে বিপুল পরিমাণ আলু কীভাবে কোথায় বিক্রি করব, সেটাই বড় প্রশ্ন। তিনি আরও জানান, আমরা যে পরিমাণ আলু সংরক্ষণ করেছি তার ৬০ ভাগ এখনো হিমাগারেই রয়েছে। আলু খালাস করে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, হিমাগার ভাড়াই হচ্ছে না। বায়ার আসমা হিমাগারের ব্যবস্থাপক আলী আশরাফ হোসেন জানান, নোটিশ দেয়ার পরও চাষিরা আলু তুলছেন না। ৩০ ডিসেম্বরের পর আলু আর রাখা যাবে না।
অন্যদিকে আলুর বর্তমান বাজারমূল্য নিয়ে চরম বিড়ম্বনার কথা জানিয়ে রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, গত দুই মৌসুমে রাজশাহীর আলু চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এবারও চাষিরা বিপুল লোকসানে পড়েছেন, আলু কিনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। পথে বসেছেন রাজশাহীর হাজার হাজার চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এই দামে আলু বেচে কোনোভাবেই খরচ তোলা সম্ভব নয়। অনেকেই আর আলু চাষ না করার কথাই ভাবছেন। সরকার অনেক কিছু নিয়ে ভাবে কিন্তু আলু চাষিদের এই দুর্দশা লাঘবে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।











