ঢাকা | অক্টোবর ২৯, ২০২৬ - ১:৪৯ পূর্বাহ্ন

রাজশাহী থেকে দিনে ২০ কোটির তাজা মাছ যাচ্ছে ২৮ জেলায়

  • আপডেট: Wednesday, October 28, 2026 - 10:29 pm

স্টাফ রিপোর্টার: ধান কিংবা অন্যান্য প্রথাগত ফসলের জমিতে পুকুর খনন করে মাছ চাষ এখন রাজশাহী বিভাগের গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এই অঞ্চলের পুকুরগুলো থেকে রুই, কাতল ও বিভিন্ন কার্পজাতীয় তাজা মাছ পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্তত ২৮টি জেলায়। বিশেষ প্রযুক্তিতে জীবিত অবস্থায় মাছ পরিবহনের এই ব্যবস্থার দরুন প্রতিদিন রাজশাহী বিভাগ থেকে গড়ে ২০ কোটি টাকারও বেশি টাকার মাছ বেচাকেনা হচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, পুরো বিভাগে বর্তমানে ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৬৫৩টি পুকুরে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৬ জন খামারি মাছ চাষে যুক্ত রয়েছেন। বিভাগে বছরে মোট মাছ উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৪৬৭ মেট্রিক টন। এর মধ্যে স্থানীয় চাহিদার যোগান নিশ্চিত করার পরও অতিরিক্ত দেড় লাখ মেট্রিক টন মাছ পাঠানো হচ্ছে দেশের অন্যান্য প্রান্তে। কেবল উৎপাদন ও বিপণন কেন্দ্র করেই এ অঞ্চলে প্রায় ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রথাগত কৃষি উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা না পাওয়ায় রাজশাহী অঞ্চলের কৃষকদের বড় একটি অংশ বাণিজ্যিক মাছ চাষের দিকে ঝুঁকেছেন। অন্যান্য ফসলের তুলনায় মৎস্য খাতে লাভজনক পরিবেশ থাকায় নতুন নতুন উদ্যোক্তা প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছেন এই পেশায়। বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া জানান, পূর্বে কেবল রাজশাহী জেলায় মিশ্র পদ্ধতিতে চাষাবাদ হলেও বর্তমানে নাটোর, নওগাঁসহ বিভাগের ৮টি জেলাতেই এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়েছে।

রুই ও কাতলার পাশাপাশি একই পুকুরে সিলভার কার্প ও দেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সমন্বিত চাষের ফলে পুকুরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা পাচ্ছে। এছাড়া পাবদা, শিং, কই ও মাগুর মাছের মতো উচ্চমূল্যের মাছ চাষ করে খামারিরা আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিচ্ছেন। বিশেষ করে এই অঞ্চলের পাবদা মাছ বর্তমানে নিয়মিত ভারতে রপ্তানি হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের সহায়তায় প্রতি বছর দেড় হাজারেরও বেশি চাষিকে আধুনিক প্রযুক্তি ও মাননিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২৪ বছর আগে রাজশাহী থেকে তাজা মাছ ঢাকাসহ দূরদূরান্তে পাঠানোর প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটে। পূর্বে পরিবহনের সময় পানির হাউজে মানুষ দিয়ে নাড়াচাড়া করিয়ে অক্সিজেন সচল রাখা হলেও, বর্তমানে ট্রাকে শ্যালো মেশিন বসিয়ে কৃত্রিমভাবে পানির প্রবাহ তৈরি করা হয়। ফলে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত মাছ পুকুরের মতোই জীবন্ত থাকে। প্রতিদিন বিকেল থেকে শুরু করে ভোররাত পর্যন্ত প্রায় ৫০০টিরও বেশি বিশেষায়িত ট্রাকে করে প্রতিদিন তাজা মাছ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। প্রতিদিনের এই ট্রাফিকে গড়ে ৭০০ থেকে ১২০০ কেজি পর্যন্ত মাছ পরিবহন করা হয়। পবা উপজেলার পারিলা গ্রামের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন জানান, সম্প্রতি তিনি এক ট্রাকে ১২০০ কেজি মাছ ঢাকার নিউ মার্কেটে নিয়ে গিয়ে ৩ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। কেবল পারিলা এলাকা থেকেই দৈনিক প্রায় ৫০টি ট্রাক দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

রাজশাহীর এই মৎস্য বিপ্লবের অন্যতম সফল উদাহরণ দুর্গাপুর উপজেলার উদ্যোক্তা গোলাম সাকলাইন। ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে পড়ালেখার সময়েই মাত্র ৭ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ২ বিঘা জমিতে তিনি মাছ চাষ শুরু করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে পুরোপুরি এই পেশায় আত্মনিয়োগ করেন তিনি। বর্তমানে তাঁর লিজ নেওয়া খামারের আয়তন প্রায় ১ হাজার বিঘা, যেখানে নিয়মিত কর্মসংস্থান হয়েছে ১৫২ জন কর্মীর। প্রতিদিন কেবল তাঁর খামার থেকেই প্রায় ২০টি ট্রাকে করে ঢাকায় মাছ সরবরাহ করা হয়। উৎপাদন বাড়লেও খামারিদের পড়তে হচ্ছে নানা প্রতিকূলতার মুখে।

দুর্গাপুরের খামারি ইদ্রিস আলীসহ স্থানীয় চাষিরা জানান, বাজারে প্রক্রিয়াজাত মাছের খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক বাড়লেও সে অনুপাতে তারা বাজারে মাছের দাম পাচ্ছেন না। পাশাপাশি জ্বালানি ও অন্যান্য খরচের কারণে প্রতিটি ট্রাকে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি পরিবহন ভাড়া গুনতে হচ্ছে, যা খামারিদের লভ্যাংশ অনেক কমিয়ে দিচ্ছে। সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, গুণগত মান ধরে রেখে দূরদূরান্তে জ্যান্ত মাছ পৌঁছানোর এই অভিনব ব্যবস্থা রাজশাহীর গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে। মৎস্য খাতের এই ধারাবাহিক সাফল্য স্থানীয় সীমা ছাড়িয়ে এখন দেশের জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় অবদান রেখে চলেছে।