ঢাকা | অক্টোবর ৫, ২০২৬ - ১১:৪৪ অপরাহ্ন

শিরোনাম

অজ্ঞাতনামা মামলায় সাংবাদিকদের ক্ষোভ, প্রশাসনিক ভবনে তালা দিলেন শিক্ষার্থী

  • আপডেট: Monday, October 5, 2026 - 11:06 pm

উত্তাল ক্যাম্পাস:

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হামলার ঘটনায় চরম উত্তাল হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস।

এ ঘটনায় জড়িতদের বিচার ও গ্রেপ্তারের দাবিতে ক্লাস বর্জন, মানববন্ধন, প্রশাসন ভবন ঘেরাও করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। সোমবার রাত সাড়ে দশটায় সবশেষ খবর অনুযায়ী রাবির প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

তদন্ত কমিটি গঠন ও ঘটনার বিবরণ:

সোমবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনার সার্বিক তদন্তে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলিম জানান, সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম-২-কে আহ্বায়ক করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এর আগে রোববার (৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে আটটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবীবের নেতৃত্বে সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। এতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধি আরিফ উজ্জামান কোরবান, আগামীর সময়ের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম, দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল এবং দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি মাঈনুল ইসলাম রাজুসহ অন্তত চারজন সাংবাদিক গুরুতর আহত হন। হামলা ও সংঘর্ষে সর্বমোট প্রায় ১০ জন আহত হয়েছেন।

হাসপাতালে আহত সাংবাদিককে দেখতে উপ-উপাচার্যদ্বয়:

অনাকাঙ্ক্ষিত এ ঘটনায় গুরুতর আহত সাংবাদিক জাহিদুল ইসলামকে দেখতে গতকাল সোমবার দুপুরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে যান উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর আব্দুল আলিম ও উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) প্রফেসর মামুনুর রশীদ। সেখানে তাঁরা কর্তব্যরত চিকিৎসকদের নিকট জাহিদুলের স্বাস্থ্যের খোঁজ নেন এবং তাঁর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

হল প্রশাসনের মামলা ও সাংবাদিকদের তীব্র ক্ষোভ:

ঘটনার পরদিন সোমবার সকালে শহিদ জিয়াউর রহমান হলের উপ-রেজিস্ট্রার মনির হোসেন বাদী হয়ে নগরীর মতিহার থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কবির এবং রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. গাজিউর রহমান মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে হামলাকারীদের স্পষ্ট পরিচয় জানার পরও ‘অজ্ঞাতনামা’ মামলা করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পেশাদার সাংবাদিকরা।

রাবি সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি ইরফান তামিম ও রাবি প্রেসক্লাবের সভাপতি আশিকুল ইসলাম ধ্রুব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভিডিও ফুটেজ ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে চিহ্নিত হামলাকারীদের পরিচয় সবার জানা। তাই অজ্ঞাতনামা মামলার সুযোগ নেই; হামলায় জড়িতদের নাম উল্লেখ করে মঙ্গলবার বিকেল চারটার মধ্যে গ্রেপ্তার না করা হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা।

শিক্ষকদের ক্লাস বর্জন ও শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন:

হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও সনদের বাতিলের দাবিতে গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় রবীন্দ্র ভবনের সামনে মানববন্ধন ও ক্লাস বর্জন কর্মসূচি পালন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ। মানববন্ধনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কঠোর সমালোচনা করেন। এতে বক্তব্য দেন বিভাগের সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন বকুল, অধ্যাপক আল-আল মামুন, অধ্যাপক মশিহুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক কাজী মামুন হায়দারসহ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলেন, শিক্ষার্থীদের রক্তাক্ত রেখে ক্লাস করানো সম্ভব নয়। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে ফৌজদারি আইনের আওতায় সাজা দেওয়া এবং ছাত্রত্ব ও সনদ বাতিলের মতো দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রশাসন ভবন ঘেরাও করে অবস্থান কর্মসূচি:

সর্বশেষ সোমবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে জড়িত ছাত্রদল নেতাদের গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবন ঘেরাও করে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন কর্মরত সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ সময় ‘বাহ! ভিসি চমৎকার, সন্ত্রাসীদের পাহারাদার’, ‘সাংবাদিকের ওপর হামলা কেন, প্রশাসন জবাব চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রশাসন ভবন প্রাঙ্গণ। অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তারা প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টরদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

আরইউজে’র তীব্র নিন্দা:

এদিকে রাবিতে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে মুক্ত গণমাধ্যমের ওপর হামলা ও সাংবাদিকদের আহত করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন (আরইউজে)। এক যৌথ বিবৃতিতে ইউনিয়নের সভাপতি মুহা: আবদুল আউয়াল ও সাধারণ সম্পাদক ডালিম হোসেন শান্তসহ নেতৃবৃন্দ বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকের ওপর ছাত্রদলের হামলা স্বাধীন সাংবাদিকতা, মুক্ত গণমাধ্যম ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য গুরুতর হুমকি।

বিবৃতিতে অবিলম্বে এ হামলার নেপথ্যে কোনো ইন্ধন ছিল কি না তা উদঘাটনসহ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দিতে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতার পেছনে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা-ও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনার জোর দাবি জানান সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।

সোনালী/জগদীশ রবিদাস