রাজশাহী রেলস্টেশনে ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা হয়নি, দুই তদন্ত কমিটি গঠন
ভাঙচুর বিষয়ে বিএনপি-জামায়াতের নিন্দা:
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত রোববার রাতে রাজশাহী রেলস্টেশনে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের উপস্থিতিতে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় ধরে এই তাণ্ডব চালান। এ ঘটনায় দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে। অন্যদিকে, পরিস্থিতি পর্যালোচনায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও বিভাগীয় প্রশাসনের উদ্যোগে পৃথক দুটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে। রাজশাহী স্টেশনে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আসিফ ও মাহিন আহমেদের সঙ্গে দায়িত্বরত রেলওয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে আইয়ুব আলী নামের অন্য এক শিক্ষার্থী তাদের সঙ্গে যোগ দিলে তাকে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্যরা বেধড়ক মারধর করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় আইয়ুব আলীকে বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীকে মারধরের পর জড়িতদের এক ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দেন রাকসু জিএস সালাউদ্দীন আম্মার। নির্দিষ্ট সময়ে জড়িতদের আটক না করায় রাত ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশন এলাকায় আগুন জ্বালিয়ে রেললাইন অবরোধ করেন।
পরবর্তীতে আম্মারের উপস্থিতিতেই রাত সাড়ে ১১টায় রাজশাহী রেলস্টেশন ঘেরাওয়ের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। আকস্মিক এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে রেল কর্তৃপক্ষ ঢাকাগামী ‘ধূমকেতু এক্সপ্রেস’ ট্রেনের যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে প্রায় চার কিলোমিটার পথ হেঁটে একদল শিক্ষার্থী রাজশাহী রেলস্টেশনে প্রবেশ করে তাণ্ডব শুরু করেন। তারা স্টেশনের মূল ভবনের টিকিট কাউন্টার, ডাস্টবিন, জানালার কাচ, পার্সেল অফিস, রেস্টহাউস, সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয়ে চরম ভাঙচুর চালান। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির হস্তক্ষেপে রাত দেড়টার দিকে শিক্ষার্থীরা স্টেশন এলাকা ত্যাগ করেন।
ভাঙচুর চলাকালে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন দলীয় নেতাদের নিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলেও শিক্ষার্থীরা তাদের ‘ভূয়া ভূয়া’ বলে তাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে পৌঁছালেও তোপের মুখে পড়ে তারা স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরদিন সকালে স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় প্রধান ফটক থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ সমস্ত কাচ ভেঙে পড়ে আছে এবং কর্মীরা সেগুলো পরিষ্কার করছেন। তবে ঘটনার পরপরই আইনগত ব্যবস্থা হিসেবে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
ঘটনা প্রসঙ্গে রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার নিজের অবস্থানে অনড় থেকে জানান যে, শিক্ষার্থীদের পক্ষে থেকে তারা কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করবেন না। কথায় কথায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার জের যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের একটা থাইগ্লাসের মায়াতুলনায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা অনেক বড় বিষয়। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই এই বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং এর জবাবে হাজারটা মামলা হলেও তাদের কিছু আসে যায় না। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) আব্দুল আলিম জানান, টিকিট না থাকলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা বা জরিমানা নেওয়া যেত, কিন্তু মারধর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং পুরো বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে।
ঘটনাটিকে অত্যন্ত নিন্দনীয় অভিহিত করে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন গণমাধ্যমকে বলেন, এত সুন্দর একটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ এভাবে ধ্বংস করা মেনে নেয়া যায় না। ছাত্ররা প্রায়শই টিকিট ছাড়া যাতায়াত করে কিংবা ট্রেনের চেইন টানে। ধ্বংসযজ্ঞ চালানো ব্যক্তিদের সব আচরণ ছাত্রদের মতো ছিল না। অন্যদিকে মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি এমাজ উদ্দিন মণ্ডল গণমাধ্যমকে বলেন, রাষ্ট্রীয় সংস্থা কর্তৃক ছাত্র নির্যাতন যেমন অনুচিত, তেমনি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করাও সমানভাবে উদ্বেগজনক।
সার্বিক ঘটনা তদন্তে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যার প্রধান করা হয়েছে রেলওয়ের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মোসাম্মাৎ হাসিনা খাতুনকে। পাশাপাশি রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের বিশেষ বৈঠকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (এডিসি) প্রধান করে পাঁচ সদস্যের আরও একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক আহম্মদ হোসেন মাসুম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দুই মাসের মধ্যে তিনবার রাবি শিক্ষার্থীদের সাথে রেলকর্মীদের বিরোধের ঘটনার সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হচ্ছে এবং তা শেষ হলেই মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সোনালী/জগদীশ রবিদাস











