শিক্ষার্থীকে মারপিটের জেরে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে তাণ্ডব
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গভীর রাতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে ব্যাপক ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালিয়েছে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
ঘটনার সময় রেলস্টেশনে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তায় ঢাকা অভিমুখী ‘ধূমকেতু এক্সপ্রেস’ ট্রেনের যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। তবে সোমবার ভোর থেকে স্টেশনে পরিচ্ছন্নতা কাজ শেষে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ট্রেন চলাচল শুরু হয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আইয়ুব আলী তাঁর চাচাকে ট্রেনে তুলে দিতে স্টেশনে যান। সেখানে দায়িত্ব পালনরত রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) কর্মচারীদের সঙ্গে ইংরেজি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর কথা-কাটাকাটি হলে আইয়ুব তাদের পক্ষে কথা বলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নিরাপত্তা কর্মী ও টিটিই মিলে আইয়ুবকে মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনার প্রতিবাদে রোববার রাত ৯টায় এক ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। তিনি এক ঘণ্টার মধ্যে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। দাবি মানা না হলে প্রতিটি ট্রেন থেকে দুজন করে কর্মচারী তুলে নেয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। এরপর রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাবি রেলস্টেশনে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির বলেন, রেললাইন ও স্টেশনকে কেন্দ্র করে রেলওয়ের কর্মচারী, কর্মকর্তা ও টিটিইদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বারবার হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এসব ঘটনার প্রতিবাদ এবং পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই তাঁরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। রাতের মধ্যে সমাধান না এলে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সহযোগিতা না করলে আন্দোলন আরও কঠোর করার কথা জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যে রাজশাহী রেলস্টেশনে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আরএনবির চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তবে এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হয়ে শিক্ষার্থীরা রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের দিকে রওনা হন। তারা ‘মার্চ টু রাজশাহী রেলস্টেশন’ কর্মসূচি নিয়ে স্টেশন অভিমুখে যাত্রা করেন এবং স্টেশন ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। দীর্ঘ সময় পার হলেও আশানুরূপ সিদ্ধান্ত না আসায় শিক্ষার্থীরা একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
তারা স্টেশনের বাইরে ও ভেতরে তাণ্ডব চালান। শিক্ষার্থীরা গাছের ডাল, বাঁশ, লাঠি ও ইটপাটকেল নিয়ে রেলওয়ে থানা, পার্সেল অফিস, নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয়, স্টেশনের বিভিন্ন কক্ষ, সাইনবোর্ড, গ্লাস, ডাস্টবিন, দোকানপাট ও সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করেন এবং রেললাইনে আগুন জ্বালিয়ে দেন। ওই সময় স্টেশনে থাকা যাত্রী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। অনেক যাত্রী শিশু ও পরিবার নিয়ে দ্রুত স্টেশন এলাকা ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে রাত প্রায় ১টা ২০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের হস্তক্ষেপে শিক্ষার্থীরা স্টেশন ছেড়ে ক্যাম্পাসে ফিরে যান। ঘটনার পরই নড়েচড়ে বসে রেলওয়ে প্রশাসন।
অনভিপ্রেত ঘটনার প্রাথমিক প্রমাণ মেলায় রোববার রাতেই রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্ত হওয়া কর্মীরা হলেন— আরএনবি সদস্য আরিফ হোসেন, রোকন উদ্দীন, শফিকুল ইসলাম ও শাহাদত হোসেন। রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর চিফ কমান্ড্যান্ট মোহা. আশাবুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক দপ্তরাদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
এদিকে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে রেলওয়ের চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিতে রয়েছেন পাকশী বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা, বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা, বিভাগীয় সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী এবং পাকশী কমান্ড্যান্ট (আরএনবি)। এছাড়া সোমবার বেলা ১১টায় রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে শীর্ষ কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিভাগীয় কমিশনারের উদ্যোগে আরও একটি ৫ সদস্যের পৃথক তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রাজশাহী রেলস্টেশনের সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শনে আসেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আহম্মদ হোসেন মাসুম। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কখনো রেলওয়ের প্রতিপক্ষ হতে পারে না। কেন জানি মনে হচ্ছে ‘রেলওয়ে ভার্সেস স্টুডেন্ট’—এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা রাজশাহীবাসী ও সাধারণ জনগণের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা গ্যাপ তৈরি হলে ঘটনা ঘটার আগেই আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করা উচিত। কোনো পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেন রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তির কারণ না হয়। জিএম আরও জানান, ভাঙচুরের ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা দ্রুত নিরূপণ করা হচ্ছে।
কর্মচারীদের বরখাস্ত করার বিষয়ে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ও প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া রোববারের সহিংসতার ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। গতকাল সোমবার সকাল থেকে অন্যান্য রুটের ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে গেলেও মধুমতী এক্সপ্রেস রাতে বিলম্ব করে পৌঁছানোয় কিছুটা সময় পিছিয়ে ছাড়তে হয়েছে। বর্তমানে রাজশাহী রেলস্টেশনে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে এসেছে এবং নিয়মিত সিডিউল অনুযায়ী রেল যোগাযোগ সচল রয়েছে।











