ঝড়ো হাওয়ায় পদ্মায় ১০-১৫ ফুট ঢেউ একাধিক নৌকাডুবি, আহত অন্তত ৭
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীতে আকস্মিক ঝড়ো হাওয়ায় হঠাৎ করেই ভয়াবহ ও উত্তাল রূপ ধারণ করেছে পদ্মা নদী। গতকাল বুধবার রাত ৯টার দিকে নদীর অববাহিকায় শুরু হয় তীব্র ঝড়। এতে সৃষ্ট ১০ থেকে ১৫ ফুট উঁচু শক্তিশালী ঢেউয়ের আঘাতে নদীতীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও পানির স্রোতের প্রভাবে রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধের বেশকিছু ব্লক সরে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উত্তাল ঢেউয়ের স্রোত থেকে নিজেদের একমাত্র সম্বল নৌকা রক্ষা করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন কয়েকজন মাঝি ও তাঁদের স্বজনেরা। এতে অন্তত ৫ থেকে ৭ জন আহত হন এবং একাধিক নৌকা ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে স্থানীয়রা আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তারা সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার পর পদ্মা নদীর তীরবর্তী কেশবপুর এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা গভীর আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, গত ৩০ বছরের মধ্যে পদ্মার এমন অস্বাভাবিক ও রূপ তাঁরা দেখেননি। আকস্মিক এ পরিস্থিতিতে নদীতীরবর্তী মানুষ ও ভাঙনকবলিত বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এদিকে, নদীতীর রক্ষাবাঁধের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। তাঁদের অভিযোগ, নদীভাঙন থেকে ঘরবাড়ি ও জীবন-জীবিকা রক্ষায় বাঁধার সংস্কার এবং টেকসই সংরক্ষণ নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
কেশবপুর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, “আমরা যারা পদ্মাতীরে বসবাস করি, তাদের স্থায়ী নিরাপত্তার জন্য নদীতীর সংরক্ষণ বাঁধ অবিলম্বে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বাঁধ সংস্কারে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ না থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়ে যায়।”
পরিস্থিতির বিষয়ে রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পদ্মা নদীর পানি ধীরগতিতে কমতে দেখা গেছে। তিনি বলেন, সাধারণত বন্যার সময় নদীতে স্বাভাবিক স্রোত থাকে। তবে এ সময়ে অতিরিক্ত বাতাস বা ঝড়ের প্রভাবে স্রোতের বেগ বহুগুণ বেড়ে যায়। বুধবার রাতের ঘটনাটিও তেমনই ছিল।
ঝড়ের কারণে নদীর স্রোত ও ঢেউ মারাত্মক রূপ নেয়। এতে কয়েকটি স্থানে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে এবং আমাদের টিম সরেজমিনে কিছু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে। তিনি আরও জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধি দল সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং পরিদর্শন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো মেরামতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানির উচ্চতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। গত পাঁচ দিনের পর্যবেক্ষণে রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানি ০.২১ মিটার (২১ সেন্টিমিটার) কমেছে। পানি বর্তমানে বিপৎসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানির উচ্চতা ১৭.০৯ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে, যা বিপৎসীমা ১৮.০৫ মিটারের চেয়ে ৯৬ সেন্টিমিটার নিচে।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মিটারগেজ রিডার এনামুল হক জানান, গত ১৩ সেপ্টেম্বর পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছিল ১৭.৩০ মিটার (বিজ্ঞপ্তিতে ১০.৩০ মিটার উল্লেখ থাকলেও ধারাবাহিক হিসাব ১৭.৩০ মিটার)। এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর ১৭.২৮ মিটার, ১৫ সেপ্টেম্বর ১৭.২৫ মিটার, ১৬ সেপ্টেম্বর ১৭.১৭ মিটার এবং ১৭ সেপ্টেম্বর পানির উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ১৭.০৯ মিটারে। ফলে গত ৫ দিনে মোট ২১ সেন্টিমিটার পানি কমেছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার বিপৎসীমা ১৮.০৫ মিটার (এমএসএল)। বর্তমানে নদীর পানি বিপৎসীমার প্রায় ৯৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তালাইমারি শহীদ মিনার এলাকার বাসিন্দা হাফিজ মিয়া জানান, গত দুই-তিন দিনে পানি অনেকটাই কমেছে। তবে এখনো অনেক বসতবাড়িতে পানি রয়েছে। পানি কমার ধারা বজায় থাকলে দ্রুতই বাড়িঘর থেকে পানি নেমে যাবে।
সোনালী/জগদীশ রবিদাস











