নেপালে বন্যা-ভূমিধসে নিহত ৩৫৯, নিখোঁজ ১৩০০
সোনালী ডেস্ক: নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সৃষ্ট আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৯ জনে দাঁড়িয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগের একদিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার নেপাল পুলিশের এক হালনাগাদ তথ্যে এই প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করা হয়।
বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নেপালেই ৩৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে নেপাল পুলিশ। অন্যদিকে, তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় পাহাড় ধসে কমপক্ষে ৩ জনের মৃত্যু ও ব্যাপক প্রাণহানির খবর জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। এতে করে দুই সীমান্ত অঞ্চল মিলিয়ে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়াল অন্তত ৩৬২ জনে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতা থেকে হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ে এবং নিচে গিয়ে নদীকে আঘাত করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল ভূমিকম্পে ধস নেমেছে, তবে পরে নিশ্চিত হয় যে ভূমিধসের ধাক্কাতেই কম্পন তৈরি হয়েছিল।
সীমান্তের চীনা অংশ থেকে পাওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গত বুধবার সকালে কয়েক তলা বিশিষ্ট একটি ভবনের ওপর সুবিশাল কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্তূপ আছড়ে পড়ছে এবং নিচে বহু মানুষ প্রাণের ভয়ে দৌড়ে পালাচ্ছেন। পানির তীব্র তোড়ে বাস ও গাড়িগুলো খেলনার মতো ভেসে যায়। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের ধারণা, হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট কাদাস্রোতের তীব্র প্রবাহ চারপাশের এলাকা প্লাবিত করেছে। এই দুর্যোগে নিখোঁজদের অনেকেই বিদেশি পর্যটক বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ভোট কোশি ও ত্রিশূলীÑএই দুটি নদীর গতিপথে থাকা শহর ও গ্রামগুলোতে সুনামির মতো বয়ে যাওয়া পানি ও কাদার তীব্র প্রবাহ আঘাত হানে।
নেপাল পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে, বিধ্বংসী এই আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা ৩৫৯ এ পৌঁছানোর পাশাপাশি এখনো ১,৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধারকর্মীরা অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, যোগাযোগবিচ্ছিন্ন বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রয়েছেন। লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিষয়ক ঐতিহাসিক রুথ গ্যাম্বল বলেন, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের এই প্রবাহটি ছিল ‘স্থলভাগের সুনামির মতো, যা ভোট কোশি উপত্যকা হয়ে মধ্য নেপালের দিকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে’। তিনি আরও বলেন,‘কাঠমান্ডু থেকে লাসা ভ্রমণকারী আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি রুট’। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) নেপাল প্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, ‘পুরো গ্রাম এবং বাজার এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে’। সংস্থাটি জানায়, তারা কম্বল, ফার্স্ট এইড কিট, স্ট্রেচার ও বডি ব্যাগসহ জরুরি ত্রাণ সামগ্রী পাঠাচ্ছে।
এর আগে গত বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে নেপালের তিনটি জেলায় ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ পাহাড়ি ঢল নেমে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হয়। অতি অল্প সময়ে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিদেশি পর্যটকসহ বিপুলসংখ্যক মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। নেপালি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাহাড়ি নদীটির প্রবল স্রোত জেলার প্রধান বাজার এলাকায় আছড়ে পড়ে। এ সময় আশপাশে থাকা মানুষ, গবাদিপশু, বহুতল ভবন এবং সরকারি অবকাঠামোসহ ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি সম্পূর্ণ গ্রাস করে ধেয়ে যায় স্রোত। এটি দেশটির সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগগুলোর একটি।
এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিখেঁাঁজদের মধ্যে ২৮৮ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া মানস সরোবর যাত্রায় গিয়ে আটকে পড়া প্রায় ২০০ জন পুণ্যার্থীকে উদ্ধারের আবেদন জানানো হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় ভারতের পক্ষ থেকে বন্যাদুর্গত নেপালে ৪৮ টন ত্রাণসামগ্রীসহ দুটি সামরিক বিমান পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে সোলার ল্যাম্প, হাইজিন কিট এবং ৮ টনেরও বেশি ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী রয়েছে। বন্যায় রাস্তাঘাট ও সেতু ধসে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নেপালের সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনী হেলিকপ্টার এবং গ্রাউন্ড টিমের সাহায্যে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করেছে। দুর্গত মানুষ ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, জরুরি খাদ্য, সুপেয় পানি ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় ও তিব্বত অঞ্চলে আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেবল একক কোনো ঘটনা নয়। হিমালয়ের ক্রমাগত অস্থিতিশীল হতে থাকা বরফ কাঠামো বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলের জনবসতি, অবকাঠামো ও পানিসম্পদকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে। সংস্থাটি জানায়, ‘এই ঘটনাটি শুরুতে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে রিপোর্ট করা হয়েছিল। তবে নিকটবর্তী ভূকম্পন কেন্দ্র, দীর্ঘ মেয়াদী ভূকম্পন তরঙ্গ এবং স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণের পর নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এটি কোনো ভূমিকম্প ছিল না, বরং হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ ছিল’। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী হিমবাহ গলে যাচ্ছে, যা হিমবাহ হ্রদের বন্যা ও হিমবাহ ধসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নদীর উজানে কোনো বাধা বা ব্লকেজ আটকে থাকলে তা থেকে দ্বিতীয় দফায় বন্যা হতে পারে। নেপাল পুলিশের শেয়ার করা ছবিতে নদীতে উপচে পড়া পানি এবং তার গতিপথে থাকা বাড়িঘর ভেসে যেতে দেখা যায়। অন্যদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি-র ছবিতে কাদা দিয়ে ঢাকা পড়া একটি বাড়ির শুধু ওপরের তলাটি জেগে থাকতে দেখা গেছে। নেপালের উত্তরাঞ্চলের রসুয়া জেলা প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে বন্যার পানি যতই নিম্নাঞ্চলের দিকে গড়িয়েছে, ভারতের সীমান্তবর্তী দক্ষিণাঞ্চলীয় চিতওয়ান পর্যন্ত মোট সাতটি নেপালি জেলা থেকে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বর্ষা মৌসুমে অনেক ট্রেকিং এজেন্সি ট্যুর পরিচালনা না করলেও, এই অঞ্চলে তীর্থযাত্রীসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যটক অবস্থান করছিলেন। বন্যার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে স্যাব রুবেসিÑযা জনপ্রিয় ট্রেকিং এরিয়াগুলোর প্রবেশদ্বার এবং বৌদ্ধ ও হিন্দুদের পবিত্র স্থান কৈলাশ পর্বতের পাদদেশে যাওয়া তীর্থযাত্রীদের রুট। নেপালি সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার দিয়ে বহু মানুষকে উদ্ধার করেছে। অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নদীর তীরে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে। সিসিটিভি-র মতে, চীনের নেতা শি জিনপিং বলেছেন, ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বা জরুরি কাজ হলো নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজা ও উদ্ধারে সম্ভাব্য সবকিছু করা’। তিব্বতের শিগাৎসের ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই এলাকার রাস্তাগুলো ‘কাদাস্রোতের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং চলাচলের জন্য নিরাপদ নয়’। কাঠমান্ডুভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট’ (আইসিআইএমওডি)-এর জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংকং ঝাং দ্বিতীয় দফায় বন্যার সম্ভাবনার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি এএফপি-কে বলেন, ‘নেপাল-চীন সীমান্ত নদীতে উজানে এখনো একটি ব্লকেজ বা বাধায় আটকে থাকায়, কর্তৃপক্ষ দ্বিতীয়বার বন্যার সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করছে’।
১০০ চীনা নাগরিক নিখোঁজ: নেপালের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যার পর প্রায় ১০০ চীনা নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে বেইজিং। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান সাংবাদিকদের বলেন, নেপালের দুর্যোগকবলিত এলাকায় প্রায় ১০০ চীনা নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
তিনি জানান, নিখোঁজ চীনা নাগরিকদের বিষয়ে নেপালের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আরও তথ্য যাচাই করছে চীনা দূতাবাস। লিন জিয়ান জানান, নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও রয়েছেন। তবে তাদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো যাচাই করা হচ্ছে। নিখোঁজদের সন্ধানে চীন ও নেপাল দুই দেশেই উদ্ধার অভিযান চলছে। উদ্ধারকাজ এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সূত্র: এএফপি











