লোডশেডিংয়ে কমেছে চাল উৎপাদন, কোল্ড স্টোরেজে পচছে আলু
নওগাঁ প্রতিনিধি: লোডশেডিং, এটি এখন একটি বড় সমস্যার নাম। যান্ত্রিক জীবনে বিদ্যুতের চাহিদা অপরিসীম। বিদ্যুৎ বিহীন সমাজ, জীবন, অর্থনীতি কোনো কিছু সম্পূর্ণ নয়। সম্প্রতি বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে সব ক্ষেত্রে। নওগাঁ জেলায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি পিএলসির (নেসকো) আওতাধীন এলাকায় প্রতিদিন গড়ে বিদ্যুতের চাহিদা ২৬০ মেগাওয়াট। তবে এর বিপরীতে বিদ্যুৎ মিলছে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ। এক্ষেত্রে শহরের পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও শহরের বাইরের এলাকায় দিনে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত থাকছে না বিদ্যুৎ।
একদিকে গরম, অন্যদিকে লোডশেডিং- সব মিলিয়ে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। রাতের ঘুম, বাচ্চাদের স্কুল, অফিস কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কোনো খানেই স্বস্তি নেই। অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে কল-কারখানাগুলোতে কমে গেছে উৎপাদন। নওগাঁয় ছোট-বড় মিলিয়ে চালকলের সংখ্যা প্রায় ৪৫০। সেগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে চাল উৎপাদন হয় দুই হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু বর্তমানে লোডশেডিংয়ের কারণে কমেছে চাল উৎপাদন।
নওগাঁ বাইপাস এলাকায় অবস্থিত তছিরন অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক আনিছুর রহমান জানান, কারখানাটিতে প্রতিদিন যে পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, তার শতকরা ৪০ শতাংশ ঘাটতি থাকছে। ফলে কমেছে চাল উৎপাদন। লোডশেডিংয়ের সময় অলস বসে থাকছেন শ্রমিকরা। ফলে কাজ না করলেও বেতন দিতে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। এমন অবস্থায় লোকসানে বেশিরভাগ মিল মালিকরা। মিল মালিকরা বলছেন, লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে চরমভাবে। গত ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ থেকে ছয় বার অন্তত এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। অনেকে ডিজেল দিয়ে মেশিন সচল রাখছেন। এতে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। লোডশেডিংয়ের কারণে বড় হুমকিতে চাষিরা। বিশেষ করে যারা কোল্ড স্টোরেজে বীজ আলু রেখেছেন, তারা বেশি ঝুঁকিতে। বিদ্যুতের অভাবে নষ্ট হচ্ছে সেসব আলু।
নওগাঁ ফয়েজ উদ্দিন কোল্ড স্টোরেজ কর্তৃপক্ষ বলছেন, প্রতিদিন গড়ে তাদের বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় দেড় হাজার কিলোওয়াট। তবে এর বিপরীতে বিদ্যুৎ মিলছে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ। ফলে আলুর জন্য ঠিকমতো পর্যাপ্ত গ্যাস উৎপন্ন করা যাচ্ছে না। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ শতভাগ সচল করা প্রয়োজন। নওগাঁ সদর উপজেলার চাষি সুরুজ মিঞা জানান, নওগাঁ শহরের বাইপাস এলাকায় বি এইচ স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজে তিনি আলু রেখেছেন ৭০ বস্তা। এর মধ্যে ১৫ বস্তা আলু তুলেছেন তিনি। কিন্তু প্রতি বস্তার আলুতে দেখা দিয়েছে পচন। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আলুর বীজ নষ্ট হয়ে দেখা দেবে সঙ্কট৷
নওগাঁর ১১ উপজেলার মধ্যে সদরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে নেসকো কর্তৃপক্ষ। তারা জানান, দুটি আলাদা ফিডারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে নেসকো। যার একটিতে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ৪০ মেগাওয়াট ও আরেকটিতে ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা রয়েছে। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরেই এ চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ মিলছে অনেক কম। ফিডার-১ এর বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে ১৮ মেগাওয়াট, আর ফিডার-২ এ পাওয়া যাচ্ছে ১১ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ।
অন্যদিকে জেলা সদররের কিছু অংশসহ জেলার সব উপজেলাতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে পল্লি বিদ্যুৎ সমিতি।
নওগাঁ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেলা ব্যবস্থাপক রেজাউল করিম জানান, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি নওগাঁয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে সমিতি-১ ও সমিতি-২ এর মাধ্যমে। গড়ে প্রতিদিন দুই সমিতির আওতায় বিদ্যুৎ প্রয়োজন প্রায় ২০০ মেগাওয়াট। কিন্তু গত জুলাই মাসের ২৭ তারিখ থেকে পরিস্থিতি কিছুটা জটিল হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে মোট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুতের বরাদ্দ মিলছে ১৩০ মেগাওয়াট পর্যন্ত। রাইস মিলগুলোর (চালকল) জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে রেজাউল করিম জানান, সুযোগ থাকলে রাইস মিলের এলাকাগুলোতে আলাদা ফিডার স্থাপন করা হতো। যেমন নওগাঁ সদরের হাপানিয়া এলাকায় বেশ কয়েকটি রাইস মিলের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আলাদা ফিডার স্থাপন করা হয়েছে। তবে যেহেতু মূল গ্রিড থেকেই বরাদ্দ কিছুটা কম মিলছে, তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে খুব বেশি সুবিধা দেয়া কঠিন।











