রাজশাহীতে গত ৬ মাসে ৫৮ নারী ও শিশু নির্যাতিত
‘লফস’-এর পরিসংখ্যান প্রকাশ:
স্টাফ রিপোর্টার: চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে গত জুন পর্যন্ত গত ছয় মাসে রাজশাহী অঞ্চলে মোট ৫৮ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা নিয়মিত পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে এই অঞ্চলে দীর্ঘ দিন যাবৎ নারী ও শিশুদের উন্নয়নে কর্মরত মানবাধিকার সংগঠন ‘লেডিস অর্গানাইজেশন ফর সোসাল ওয়েলফেয়ার’ (লফস)। লফসের ডকুমেন্টেশন সেলের সংগৃহীত তথ্যে দেখা গেছে, নির্যাতিতদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৪০ জন এবং শিশুর সংখ্যা ১৮ জন।
সংস্থাটির মতে, রাজশাহী অঞ্চলে নারী ও শিশু নির্যাতন পরিস্থিতি বিভিন্ন মাত্রায় অবনতির দিকে যাচ্ছে। তাঁদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যৌতুক প্রথা এবং পরকীয়ার মাত্রাতীত বৃদ্ধির ফলে অধিকাংশ নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদেশি কিছু টিভি সিরিয়াল পরকীয়াকে উৎসাহিত করছে বলেও লফস মনে করে। এছাড়া পারিবারিক কলহ ও প্রেমঘটিত কারণে হত্যা, আত্মহত্যা ও অমানবিক নির্যাতন এবং কিশোর গ্যাং ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, যা কারও জন্যই সুখকর নয়।
ছয় মাসের নির্যাতনের পরিসংখ্যানগত চিত্র: লফসের পক্ষ থেকে গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া অপরাধের যে পরিসংখ্যানগত চিত্র প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে দেখা যায় এই ছয় মাসে মোট ৬ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ২ জন শিশু ও ৪ জন নারী। এছাড়া হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছে ১ জন শিশু। এই সময়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে মোট ৮টি, যার শিকার ১ জন শিশু ও ৭ জন নারী। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে এই অঞ্চলে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭ জন, যার মধ্যে ৩ জন শিশু এবং ৪ জন নারী। ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছে ২ জন শিশু।
অপহরণের শিকার হয়েছে ২ জন শিশু এবং অপহরণের চেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ১ জন শিশু। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩ জন নারী। এছাড়া নিখোঁজ হয়েছেন ২ জন, যার মধ্যে ১ জন শিশু ও ১ জন নারী রয়েছেন। শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন মোট ৪ জন, যার মধ্যে শিশু ২ জন এবং নারী ২ জন। অন্যদিকে, বলাৎকারের শিকার হয়েছে ২ জন শিশু। এই ছয় মাসে সর্বাধিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ১ জন শিশু ও ১৯ জন নারীসহ মোট ২০ জন বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
অমানবিক কিছু ঘটনার বিবরণ: সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে গত ছয় মাসে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও উদ্বেগজনক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ এবং সমাজকর্ম বিভাগের দুই ছাত্রীর আত্মহত্যা, কাটাখালী ও বাগমারায় প্রতিবন্ধী কিশোরী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা, এবং নগরীতে সৎ পিতার দ্বারা এক কিশোরীর ধষর্ণের শিকার হয়ে গর্ভধারণের মতো অমানবিক ঘটনা। এছাড়া পবা ও দুর্গাপুরে শিশু অপহরণ ও হত্যা, তানোরে শিশু ও স্কুলছাত্রী ধর্ষণ ও অপহরণের পর গ্রাম্য সালিশে মীমাংসা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হয়রানি ও শ্লীলতাহানির অভিযোগের বিষয়গুলো প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে লফস আরও জানায়, তানোরে প্রবাসীর স্ত্রীর শ্লীলতাহানি, বাবার সম্পত্তির ভাগ চাওয়ায় বোনের ওপর ভাইয়ের নির্যাতন, পুঠিয়ায় সাধু ফকিরের আস্তানায় স্বামীর সহযোগিতায় নারী ধর্ষণ, এবং নগরীর খড়খড়ী এলাকায় ছেলে কর্তৃক মাকে কুপিয়ে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনাও এই সময়ে ঘটেছে। এছাড়া বোয়ালিয়া থানার ওসির বিরুদ্ধে এক নারীকে হয়রানি এবং বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া উপদেষ্টার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগের বিষয়গুলোও লফসের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সার্বিক এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত হতাশাজনক ও উদ্বেগজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন লফসের নির্বাহী পরিচালক শাহানাজ পারভীন। তিনি উল্লেখ করেন, সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বাইরেও সমাজে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয় না বা যার তথ্য জানা যায় না। বর্তমান বাস্তবতায় অপরাধের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে তিনি নতুন সরকারের কাছে অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, অপরাধীরা যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না পায়, তবে তারা ক্রমশ আরও উৎসাহিত হবে এবং সমাজে অপরাধের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে। এর পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ধরনের গুজব প্রতিরোধে সরকারকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন লফসের এই নির্বাহী প্রধান।
সোনালী/জগদীশ রবিদাস










