ঢাকা | জুন ২১, ২০২৬ - ২:২১ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

উত্তপ্ত পদ্মার চর: ৯ মাসে ৭ খুন, আতঙ্কে বাঘাসহ ৪ উপজেলার মানুষ

  • আপডেট: Saturday, June 20, 2026 - 11:15 pm

লালন উদ্দীন, বাঘা থেকে: পদ্মার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে অবৈধ বালু উত্তোলন আর কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আবারও শুরু হয়েছে রক্তাক্ত সংঘাত। চরের দখলদারি ধরে রাখতে ব্যবহার হচ্ছে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। আধিপত্য বিস্তারের এই নির্মম খেলায় গত ৯ মাসে পদ্মার চরে ঝরেছে অন্তত ৭টি প্রাণ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় বিশেষ অভিযান সত্ত্বেও ‘বালুখেকো’ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বন্ধ করা যাচ্ছে না। রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়া—এই চার জেলার সীমান্তঘেঁষা চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ এখন সশস্ত্র গ্যাংগুলোর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সবশেষ গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) নাটোরের লালপুর উপজেলার রাইটার চর এলাকায় পদ্মা নদী থেকে সাহাবুল ইসলাম (৪৫) নামের এক ব্যক্তির গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত সাহাবুল পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সাঁড়া গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা। লালপুর থানা-পুলিশের মতে, ভোরের দিকে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে দুর্বৃত্তরা বেপরোয়া গুলি চালিয়ে তাকে হত্যা করে। এ সময় এক মৎস্যজীবীও গুলিবিদ্ধ হন, যিনি বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর আগে গত ৯ জুন চরজাজিরা এলাকায় একটি ভাসমান স্পিডবোট থেকে আজিজুল হাকিম নামের এক তরুণের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। একের পর এক এসব হত্যাকাণ্ডের পর পুরো চরাঞ্চলে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পদ্মার চরাঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অন্তত ১১টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পুলিশের তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে কাঁকন বাহিনী, মন্ডল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাঈদ বাহিনী, লালচাঁদ বাহিনী, রাখি বাহিনী, শরীফ কাইগি বাহিনী, রাজ্জাক বাহিনী, চল্লিশ বাহিনী, বাহান্ন বাহিনী এবং সুখচাঁদ-নাহারুল বাহিনী অন্যতম। স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে চরে সবচেয়ে বেশি দাপট দেখাচ্ছে ‘কাঁকন বাহিনী’। এই বাহিনীর প্রধান  হাসানুজ্জামান কাঁকন ওরফে ইঞ্জিনিয়ার কাঁকন। তার পৈতৃক নিবাস কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে হলেও বর্তমানে তিনি পাবনার ঈশ্বরদীতে বসবাস করেন। ২০০৫ সালে তৎকালীন কুখ্যাত ‘পান্না বাহিনী’র প্রধান পান্না ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার পর এবং পরবর্তীতে তার প্রতিপক্ষ লালচাঁনসহ বহু সন্ত্রাসী বন্দুকযুদ্ধে মারা গেলে চরে কিছুদিন শান্তি ছিল। কিন্তু কয়েক বছর পর রাজনৈতিক আশ্রয়ে কাঁকন নতুন করে এই বাহিনী গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশের নথি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত চরের দখল আর বালু বিক্রি নিয়ে একের পর এক ৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ২০২৬ সালের এই ছয় মাসেই ঘটেছে ৪টি খুন। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে গত বছরের ২৭ অক্টোবর। ওই দিন রাজশাহী বাঘা সীমান্তের খানপুর ও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর হবিরচরের দক্ষিণে চৌদ্দহাজার চরে খড় কাটাকে কেন্দ্র করে কাঁকন বাহিনীর সঙ্গে অন্য বাহিনীর গোলাগুলি হয়। এতে বাঘা উপজেলার গড়গড়ি ইউনিয়নের খানপুরের মিনহাজ মন্ডলের ছেলে আমান মন্ডল এবং একই গ্রামের শুকুর মন্ডলের ছেলে নাজমুল হোসেন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পরদিন ২৮ অক্টোবর হবিরচর এলাকা থেকে কুষ্টিয়ার লিটন হোসেন নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ, যিনি কাঁকন বাহিনীর সক্রিয় সদস্য বলে পরিচিত ছিলেন।

এরপর মাস দুয়েক চরাঞ্চল কিছুটা শান্ত থাকলেও চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি গভীর রাতে নতুন করে নৃশংসতা শুরু হয়। ওই রাতে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের পলাশি ফতেপুর করালি নওশারার চরের কালু মন্ডলের বাড়ি ঘেরাও করে তার ছেলে সোহেল রানাকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর পুলিশি তৎপরতায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও গত ১৮ মে গভীর রাতে বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের কালিদাসখালী চরে আবারও হামলা চালায় একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই স্বপন বেপারী (৪০) নামের এক ব্যক্তি নিহত হন এবং হত্যার পর তার লাশটি ট্রলারে করে তুলে নিয়ে যায় ওই বাহিনী। এই ঘটনার তিন সপ্তাহ পর গত ৯ জুন পদ্মার চরের খানপুরের হবিরচরের রায়টা এলাকার চর জাজিরায় বাগাতিপাড়া উপজেলার হিজলি পাবনা পাড়া গ্রামের আব্দুল শেখের ছেলে আজিজুল হাকিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যার লাশ নৌ-পুলিশ একটি ভাসমান স্পিডবোটের ভেতর থেকে উদ্ধার করে। আর সবশেষ গত মঙ্গলবার লালপুরের চরে সাহাবুল ইসলামকে গুলি করে হত্যার মাধ্যমে ৯ মাসে খুনের সংখ্যা দাঁড়ায় সাতে।

চরাঞ্চলে অপরাধ দমনে পুলিশ ‘অপারেশন ফাস্ট লাইট’ নামের বিশেষ অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত ২০৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সেরাজুল হক নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া গত ১৮ মে-র হত্যাকাণ্ডের পর চার উপজেলার সীমান্ত চরে যৌথ অভিযানে ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র, পিস্তল, কার্তুজ, স্পিডবোট এবং প্রচুর দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এর আগে গত বছরের ১৭ জুলাই সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশের দিনভর এক যৌথ অভিযানে নাটোরের দিয়াড়বাহাদুর মোল্লা ট্রেডার্স বালুমহালে কাঁকন বাহিনীর আস্তানা থেকে ৩টি পিস্তল, ৪৮ রাউন্ড গুলি, মানুষের মাথার খুলি এবং নগদ ১২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছিল।

যোগাযোগ করা হলে সব অভিযোগ অস্বীকার করে কাঁকন বলেন, আমার বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক। এসব ঘটনার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমার নানার সূত্রে পদ্মার চরে ১ হাজার ৮০০ বিঘা জমি রয়েছে, নতুন চর জাগলে সেখানে আমাদের জমি থাকে, তবে আমরা কখনো জমি দখল করতে যাই না। তিনি উল্টো অভিযোগ করেন, গত ৫ আগস্টের পর থেকে তাদের লোকজনের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে এবং পুলিশ তাদের মামলা নিচ্ছে না। বিভিন্ন তদন্তে তারা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

এ বিষয়ে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার মো. শামীম হোসেন বলেন, পদ্মা চরের এই সংঘাত ও খুনোখুনি দীর্ঘদিনের পুরোনো সমস্যা। পুলিশ এটি নিয়ন্ত্রণে নিরলস কাজ করছে। ভৌগোলিক কারণে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তের দিকে এই অপরাধ বেশি হয় এবং দুর্গম চরে গুলি চালিয়ে অপরাধীরা দ্রুত আত্মগোপন করে। তিনি আরও জানান, সন্ত্রাসীদের মূল উৎপাটন করতে ইতিমধ্যেই রাজশাহী রেঞ্জের পক্ষ থেকে খুলনা রেঞ্জের পুলিশের সাথে সমন্বয় সভা করা হয়েছে এবং চরাঞ্চলে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

সোনালী/জগদীশ রবিদাস