ঢাকা | জুলাই ৩১, ২০২৬ - ১১:২৪ অপরাহ্ন

সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও রাজশাহীতে খালি হচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়!

  • আপডেট: Friday, July 31, 2026 - 10:33 pm

শিক্ষার্থী টানছে কিন্ডারগার্টেন:

স্টাফ রিপোর্টার: শিক্ষকের সংখ্যা ও আর্থিক প্রণোদনা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাথমিকে ভৌত অবকাঠামোর আমূল পরিবর্তন এসেছে। তবুও রাজশাহী বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আশঙ্কাজনক হারে কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। গত এক যুগে বিভাগের আটটি জেলায় সরকারি প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমেছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯৮৩ জন।

বিপরীতে শিক্ষার্থী বাড়ছে কিন্ডারগার্টেন, বেসরকারি শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসাগুলোতে। শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষাবিদরা শিক্ষার্থী হ্রাসের এই প্রবণতাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় তদারকির অভাব ও শিক্ষক বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট অভিভাবকরা।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৪ সালে বিভাগে সরকারি প্রাথমিকে ভর্তি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ২০ হাজার ৯৭৫ জন। দীর্ঘ ১২ বছর পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সে সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৯৯২ জনে। অথচ এই এক যুগে বিভাগে জনসংখ্যা বেড়েছে ২৫ লাখের বেশি।

অন্যদিকে, একই সময়ে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৯৬৬ জন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩০ জনে। পাশাপাশি ইবতেদায়ি, কওমি ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থী ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৪৮৭ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৩৪৯ জন হয়েছে।

স্থানীয় একাধিক অভিভাবকের অভিযোগ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত পাঠদান তদারকিতে দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার স্কুলগুলোতে নতুন শিক্ষক পদায়ন হলেও অল্প সময়ের মধ্যে বদলি বা প্রেষণে (সংযুক্তি) তারা সুবিধাজনক এলাকার স্কুলে চলে যান। ফলে দুর্গম এলাকার স্কুলগুলোতে মারাত্মক শিক্ষক সংকট তৈরি হচ্ছে। কোথাও প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিক্ষক থাকলেও চরাঞ্চলের স্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক মিলছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

মোহনপুর উপজেলার কামারপাড়ার অভিভাবক সাকিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, অনেক শিক্ষক দূর থেকে আসেন এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই চলে যান। ফলে পড়ালেখার সেই আন্তরিক পরিবেশ বজায় থাকে না। রাজশাহীর অপর এক অভিভাবক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বিনা মূল্যে পড়ার সুযোগ থাকলেও গুণগত শিক্ষার মানে অসন্তুষ্ট হয়ে অনেকেই সন্তানদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছেন।

স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমার বাস্তব চিত্র নিশ্চিত করেছেন শিক্ষকরাও। বাগমারা উপজেলার কান্তানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফরোজা খাতুন সাংবাদিকদের জানান, তার স্কুলে এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০০ থেকে কমে ৬০ জনে নেমেছে।

একই উপজেলার উপকণ্ঠ আটকোষি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নীলুফা আক্তার খানম জানান, পাঁচ বছর আগের ৫ শতাধিক শিক্ষার্থীর স্থানে বর্তমানে শিক্ষার্থী ৩ শতাধিক। কারণ হিসেবে তারা নিকটবর্তী এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসা গড়ে ওঠার বিষয়টিকে তুলে ধরেন।

বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক আক্তার বানু মনে করেন, অভিভাবকরা সন্তানকে সরকারি প্রাথমিকে পাঠাতে অনীহা দেখাচ্ছেন মূলত: আস্থার ঘাটতি থেকে। শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক হাবিবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, সরকার বেতন-ভাতা ও অবকাঠামোয় বিপুল ব্যয় করলেও প্রত্যাশিত ফলাফল আসছে না। পাঠদান তদারকিতে ঘাটতি রয়েছে এবং অধিকাংশ স্থানে শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা সম্ভব হয়নি। নীতিনির্ধারকদের উচিত দ্রুত তদারকি জোরদার করা এবং শিক্ষক বণ্টনে ভারসাম্য আনা।

সার্বিক বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম আনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, শিক্ষক সংকট এবং সরকারি স্কুলের প্রতি অভিভাবকদের অনীহা ও আস্থাহীনতার কারণেই মূলত শিক্ষার্থী কমেছে। পাশাপাশি কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও শিক্ষার্থী হ্রাসের পেছনে একটি কারণ হতে পারে।

সোনালী/জগদীশ রবিদাস