স্টেরয়েড ও ব্রয়লার ফিডে মোটাতাজা হচ্ছে কোরবানির পশু
মিজান মাহী, দুর্গাপুর থেকে: রাজশাহীর দুর্গাপুরে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে স্টেরয়েড ও ব্রয়লার ফিড ব্যবহার করে গবাদিপশু মোটাতাজা করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কিছু খামারি, ব্যবসায়ী ও গ্রাম্য পশুচিকিৎসক দ্রুত লাভের আশায় এই ক্ষতিকর ও অবৈধ পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, এসব পশুর মাংস মানবদেহের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার অনেক খামারি ও মৌসুমি ব্যবসায়ী ঈদের আগে কম দামে হাড্ডিসার গরু-ছাগল কেনেন। এরপর স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধ ও ব্রয়লার মুরগির ফিড খাইয়ে সেগুলো দ্রুত মোটাতাজা করেন। এই প্রক্রিয়ায় একশ্রেণির অসৎ গ্রাম্য পশুচিকিৎসকের সহায়তা নেয়া হয়। ফলে কোরবানি ঈদের দুই-আড়াই মাস আগে থেকেই গ্রামাঞ্চলে এসব হাতুড়ে চিকিৎসকদের আনাগোনা ও তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, কিছু গ্রাম্য পশুচিকিৎসক খামারিদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক গরু মোটাতাজাকরণের কাজ করেন। তাঁরা বিভিন্ন ক্ষতিকর ইনজেকশন ও নিষিদ্ধ ওষুধ প্রয়োগ করে অতি অল্প সময়ে কৃত্রিম উপায়ে পশুর ওজন বাড়িয়ে দেন।
উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন নজরুল ইসলাম বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ঈদের আগে কিছু অসাধু ব্যক্তি স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করেন। তবে স্টেরয়েডের চেয়েও ব্রয়লার মুরগির খাবার (ফিড) খাওয়ানো পশুর মাংস মানবদেহের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক। তিনি আরও বলেন, এসব অপতৎপরতা বন্ধে আমরা নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা, উঠান বৈঠক ও প্রচারণা চালাচ্ছি। তারপরও কিছু ব্যক্তি প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনে এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় কোরবানির জন্য ৪৪ হাজার ৪৯০টি গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে। স্থানীয় চাহিদার তুলনায় এখানে প্রায় ২০ হাজার ২১০টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। পাশাপাশি ১ হাজার ৪৩৭টি পরিবার সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে গরু, ছাগল ও মহিষ মোটাতাজা করেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্গাপুর উপজেলায় শতাধিক পেশাদার গরুর ব্যাপারী ছাড়াও অসংখ্য মৌসুমি পশু ব্যবসায়ী রয়েছেন। তাঁরা কোরবানির হাটকে কেন্দ্র করে মাত্র দুই থেকে তিন মাসের জন্য এই ব্যবসায় যুক্ত হন। অভিযোগ রয়েছে, পশু দ্রুত মোটাতাজা করতে তাঁরা ভারতীয় নিষিদ্ধ স্টেরয়েডসহ ক্ষতিকর দেশীয় ওষুধ ব্যবহার করেন। এসব ওষুধ স্থানীয় ফার্মেসি তো বটেই, এমনকি কিছু মুদিদোকানেও গোপনে বিক্রি করা হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মেহেদী হাসান সোহাগ বলেন, স্টেরয়েড ও রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে মোটাতাজা করা পশুর মাংস মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এসব ক্ষতিকর উপাদান মাংসের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে কিডনি, লিভার নষ্টসহ নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগ সৃষ্টি করতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রাম্য পশুচিকিৎসক স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেন, অনেক খামারি দ্রুত গরুর শরীরে মাংস ও চর্বি বাড়াতে চান। প্রাকৃতিক উপায়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার ধৈর্য তাঁদের থাকে না। বাড়তি মুনাফার লোভে খামারিদের চাপের কারণেই অনেক সময় বাধ্য হয়ে এই অবৈধ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধে পশুর প্রকৃত অর্থে কোনো শারীরিক বৃদ্ধি বা মাংস বাড়ে না। এসব ওষুধ মূলত পশুর শরীরে কৃত্রিমভাবে পানি ধরে রাখে, যার ফলে পশুকে সাময়িকভাবে ফোলা ও মাংসল দেখায়। বর্তমানে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে এর ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। চরাঞ্চল বা কোথাও এমন নিষিদ্ধ ওষুধের ব্যবহার করা হচ্ছে-এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আমরা দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেব।











