ঢাকা | এপ্রিল ১৬, ২০২৬ - ১:৫৯ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

বৃষ্টির জলে চাষ: বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষির নতুন দিগন্ত

  • আপডেট: Wednesday, April 15, 2026 - 10:00 pm

স্টাফ রিপোর্টার: এক সময়ের ধু-ধু মরুপ্রায় আর শুষ্ক জনপদ এখন দেশের অন্যতম প্রধান শস্যভাণ্ডার। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আধুনিক সেচ ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে খাল খনন ও ভূ-পরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি ও অর্থনীতিতে এসেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ১৯৯১-৯২ সালে যাত্রার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির নানামুখী কর্মকাণ্ডে এই অঞ্চলের পরিবেশগত বিবর্তন এখন দৃশ্যমান।

সদর উপজেলার ৬৫ বছর বয়সী প্রবীণ কৃষক জুবাইয়ের হোসেন তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পানি সরবরাহ করায় আমাদের কৃষিতে বিপ্লব ঘটতে যাচ্ছে। খাল খনন করে নদী থেকে পানি আনা এবং পুকুর সংস্কার করে ওপরের পানির ব্যবহার বাড়ানোয় চাষাবাদ সহজ হয়েছে। তার মতে, বিএমডিএ-র দক্ষতা ও চারা রোপণের কার্যক্রমে এই অঞ্চলের সামগ্রিক চেহারা বদলে গেছে। একই সুর শোনা গেল স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মাতিনের কণ্ঠেও। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী পদক্ষেপ ও বিএমডিএ-র বাস্তবমুখী পরিকল্পনা আজ কৃষকের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটাচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়ন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিএমডিএ-র কার্যক্রম এই জেলায় ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ১৬৩৯টি ফোর্স মোড পাম্পের মাধ্যমে ৬২,০০০ হেক্টর জমিতে বছরে তিনটি ফসল চাষ হচ্ছে, যা আগে ছিল মাত্র একটি। বর্তমানে বছরে ৬.৫০ লাখ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদিত হচ্ছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৬২৫ কোটি টাকা। জমিতে চাষের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে নদীর পানি। মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদী থেকে ১০০টি এলএলপি পাম্পের মাধ্যমে ৪০০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও পানির অপচয় রোধে ২০০৩ সাল থেকেই এখানে স্মার্ট কার্ড ভিত্তিক প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

শুধু সেচ নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিএমডিএ এ পর্যন্ত প্রায় ১.৫০ কোটি ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করেছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ২৩০ কিমি খাল এবং ১০৯১টি পুকুর পুনঃখনন করা হয়েছে, যা ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ কমিয়ে পরিবেশ রক্ষা করছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নেও সংস্থাটি অনন্য ভূমিকা রেখেছে। ২৩৪টি স্থাপনার মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ মানুষের জন্য সুপেয় পানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ১৮৬ কিমি সংযোগ সড়ক ও ১৪০০ কিমি বারিড পাইপ নির্মাণ করা হয়েছে, যা কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে বড় ভূমিকা রাখছে।

আসছে বিশাল দুই প্রকল্প: চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়ন কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আল মামুনুর রশিদ জানান, মহানন্দা নদীর পানি ব্যবহার করে আরও ১৮,০০০ হেক্টর তীব্র খরাপ্রবণ এলাকায় সেচ সুবিধা পৌঁছে দিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রায় ১৪২৬ কোটি টাকার দুটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ১. ডাবল লিফটিং পদ্ধতি প্রকল্প: আনুমানিক ব্যয় ৮৩৯ কোটি টাকা। ২. জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব প্রশমন প্রকল্প: আনুমানিক ব্যয় ৫৮৭ কোটি টাকা। এই প্রকল্পগুলোর আওতায় আরও ২১০ কিমি খাল ও ১৫০টি পুকুর পুনঃখননসহ ৫.৫০ লক্ষ বৃক্ষরোপণ এবং সোলার সেচ যন্ত্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারহাত তাসনীম বলেন, বিএমডিএ যেহেতু কৃষি ও সেচ ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত দক্ষ, তাই তাদের এই কাজে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা হলে বরেন্দ্র অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটবে। নির্দিষ্ট কাজে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। আধুনিক প্রযুক্তি আর প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ সমন্বয় ঘটিয়ে বিএমডিএ যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তা আজ সারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় একটি অনন্য মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে এই প্রতিষ্ঠানটি বরেন্দ্র অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে দিতে সক্ষম হবে।

সোনালী/জগদীশ রবিদাস