সিটি হাটের ময়লার পাহাড়, ঝুঁকিতে শিক্ষার্থী-ব্যবসায়ীরা
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর অন্যতম বৃহৎ পশুর হাট সিটি হাট এখন আবর্জনার বিশাল স্তূপের নিচে ঢাকা পড়তে বসেছে।
প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে জনবহুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এই এলাকাটি বর্তমানে পরিবেশদূষণ এবং চরম জনদুর্ভোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। পচা বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধ আর স্বাস্থ্যঝুঁকি মাথায় নিয়েই প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই হাটে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর বিভিন্ন এলাকার প্রতিদিনের বর্জ্য ট্রাকে করে এনে ফেলা হয় সিটি হাট সংলগ্ন ১৬ একর আয়তনের এই উন্মুক্ত স্থানে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৫০ টন বর্জ্য এখানে জমা হয়। টানা ২৩ বছর ধরে একই স্থানে বর্জ্য ফেলার ফলে এটি এখন একটি বিশাল ময়লার পাহাড়ে রূপ নিয়েছে।
অথচ পাঁচ দশক আগে যখন এই হাট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন এটি ছিল শহরের উপকণ্ঠে এবং প্রধান আবাসিক এলাকাগুলো থেকে বেশ দূরে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় শহরের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং নতুন নতুন বসতি গড়ে ওঠায় হাট ও আবাসিক এলাকার মধ্যকার ব্যবধান ঘুচে গেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বাইপাস সড়ক সংলগ্ন এই ময়লার ভাগাড়টি এখন নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার জন্য বড় এক সংকটে রূপ নিয়েছে।
সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে গবাদিপশুর বেচাকেনায় মুখর থাকা এই হাটে আসা ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা দীর্ঘ সময় ধরে বর্জ্যের দুর্গন্ধের মধ্যে অবস্থান করতে বাধ্য হন। শুধু হাটেই নয়, এর আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দা এবং সংলগ্ন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও এই দূষিত পরিবেশের মাঝেই নিয়মিত যাতায়াত ও পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এত কাছে এমন ভাগাড় অবস্থান করায় অভিভাবক ও স্থানীয় মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে গৃহস্থালির বর্জ্য ও পশুর বর্জ্যের পাশাপাশি এই ভাগাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসাবর্জ্য ফেলারও অভিযোগ রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যকে আরও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশগত সংকট ও স্বাস্থ্যঝুঁকির এই চিত্র ছাড়াও ভাগাড়টিকে কেন্দ্র করে ভিন্ন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার বহু দরিদ্র নারী-পুরুষ প্রতিদিন এই বিষাক্ত আবর্জনার স্তূপ থেকে প্লাস্টিক, লোহা ও কাচের মতো বিভিন্ন ভাঙারি সামগ্রী কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।
যদিও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ২৩ বছর ধরে ওই এলাকায় শহরের যাবতীয় বর্জ্য ফেলার কারণে জায়গাটি ইতিমধ্যে ভরে গেছে এবং বর্জ্য ফেলার জন্য বিকল্প নতুন জায়গা খোঁজার পাশাপাশি এগুলো প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ভাগাড়টি অন্যত্র সরিয়ে নিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলবে না। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত ও পরিচ্ছন্ন বর্জ্য সংগ্রহ, নিরাপদ পরিবহন, বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী সঠিক পৃথকীকরণ এবং পরিবেশসম্মত বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা। অন্যথায় এক এলাকার ময়লা সরিয়ে অন্য এলাকায় নতুন করে একই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে বর্ধিত এই নগরায়ণের যুগে সিটি হাটের এই ভাগাড় জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।











