ঢাকা | অক্টোবর ২৮, ২০২৬ - ১২:১০ পূর্বাহ্ন

চারঘাটে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সেবার বেহাল দশা

  • আপডেট: Tuesday, October 27, 2026 - 10:43 pm

চারঘাট প্রতিনিধি: রাজশাহীর চারঘাটে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে ভেঙে পড়েছে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা। নিয়মিত খোলা হয় না এসব কেন্দ্র। কখনো খোলা থাকলেও অনুপস্থিত থাকেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। ছয় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে ওষুধ সরবরাহ।

কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও জনবল সংকটে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রামের মানুষ। বাধ্য হয়ে সামান্য অসুস্থতায়ও তাঁদের নির্ভর করতে হচ্ছে গ্রাম্য চিকিৎসক ও ওষুধের দোকানের ওপর। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ছুটতে হচ্ছে দূরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা, স্বাভাবিক প্রসব, মা ও নবজাতকের পরিচর্যা, পরিবার পরিকল্পনা পরামর্শ, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ, শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা, কিশোর-কিশোরীদের প্রজননস্বাস্থ্য পরামর্শ এবং সাধারণ রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার কথা। পাশাপাশি বিনামূল্যে ৩০ ধরনের ওষুধ বিতরণ এবং জটিল রোগীদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা উপযুক্ত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকার কথা। প্রতিটি কেন্দ্রে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা, ফার্মাসিস্ট, আয়া এবং এমএলএসএস কাম নিরাপত্তাপ্রহরী বা অফিস সহায়কের পদ রয়েছে।

চারঘাট উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে চারটিতে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) ও এর আগের শনিবার (১৭ অক্টোবর) সরেজমিনে এসব কেন্দ্রের কার্যক্রম পরিদর্শন করে বেহাল চিত্র দেখা গেছে। ভায়ালক্ষীপুর ও ইউসুফপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে দুইদিনই তালা ঝুলতে দেখা যায়। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সংশ্লিষ্ট কাউকে পাওয়া যায়নি। নিমপাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলা থাকলেও সেখানে শুধু ফার্মাসিস্টকে পাওয়া গেছে। পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার পদায়ন থাকলেও তাঁকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি।

গত শনিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভায়ালক্ষীপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে অবস্থান করেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। কেন্দ্রটির আশপাশে তৈরি হয়েছে ঝোপঝাড়। স্থানীয় বাসিন্দা জিনারুল ইসলাম বলেন, শনিবার কেন্দ্রটি কখনোই খোলা হয় না। রোগীদের জানানো হয়, শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি। ফলে শনিবার রোগীরাও আর সেখানে যান না। পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা ও অফিস সহায়কের পদায়ন থাকলেও অধিকাংশ দিন শুধু অফিস সহায়ককে পাওয়া যায়। তিনিও কয়েক ঘণ্টা থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ করে চলে যান।

স্থানীয় বাসিন্দা রঙিলা বেগম বলেন, আগে এই কেন্দ্রে গর্ভবতী নারী ও শিশুরা প্রাথমিক চিকিৎসা পেতেন। এখন শুধু পিয়ন বসে থাকেন। সামান্য অসুস্থ হলেও ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয়। স্থানীয় ওষুধের দোকানে গেলে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে হাজার টাকার বিল ধরিয়ে দেয়া হয়।

কেন্দ্রটি বন্ধ থাকার বিষয়ে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা আম্বিয়া খাতুন বলেন, শনিবার পূজার ছুটির কারণে কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। রবিবার থেকে খুলবো। তবে শনিবার সরকারি ছুটি নয় এবং তিনি নিজেও হিন্দু ধর্মাবলম্বী নন, এমনটি জানানো হলে তিনি পরে বলেন, ব্যক্তিগত ভাবে ছুটি কাটাচ্ছি, এটি সরকারি ছুটি নয়। আগের শনিবারও অসুস্থতার কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোনে জানিয়েছিলাম। অফিস সহায়ক কেন আসেনি, সে বিষয়ে আমি কিছু জানিনা।

ইউসুফপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গত শনিবার দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত অবস্থান করেও তালা ঝুলতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দা জিল্লুর রহমান বলেন, অধিকাংশ সময়ই কেন্দ্রটি বন্ধ থাকে। ওষুধ সরবরাহ নেই, আবার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও নিয়মিত আসেন না। ফলে গ্রামের মানুষ সামান্য জ্বর-কাশির চিকিৎসার জন্য ওষুধের দোকানে গিয়ে হাজার হাজার টাকা খরচ করছেন। সঠিক পরামর্শ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁরা। কেন্দ্রটি বন্ধ থাকার বিষয়ে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ফারজানা ইয়াসমিনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। ছুটিতে আছেন কি না জানতে চাইলে পরে জানাবেন বলে তিনি জানান।

চারঘাট উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রে ওষুধ না থাকলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা গ্রামের মানুষকে সঠিক পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন। কিন্তু তাঁরা নিয়মনীতি মানছেন না। কখন কেন্দ্র খোলে আর কখন বন্ধ হয়, তা তাঁদের বাইরে কেউ জানেন না। জনগণের টাকায় বেতন নিয়ে জনগণের সঙ্গেই এমন আচরণ করা হচ্ছে।

ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোর তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ফয়সাল ফেরদৌস বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কেন বন্ধ ছিল, তা খোঁজ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ডিসেম্বর থেকে ওষুধের সংকট আর থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়ার ঘন্টা খানেক পর বন্ধ দুটি কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তদের শোকজ লেটারের কপি প্রতিবেদকের কাছে পাঠিয়েছেন তিনি। শোকজ লেটারস শনিবার পূর্ণ কর্মদিবস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার ব্যাখা আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে দাখিল করতে বলা হয়েছে।