বরেন্দ্রের রোদে সোনালী স্বপ্ন: সূর্যের আলোয় জাগছে তৃষ্ণার্ত মাটি
স্টাফ রিপোর্টার: রোদের তেজ বাড়ার সাথে সাথে গর্জে উঠছে না কোনো ডিজেল ইঞ্জিন, কানে আসছে না মেটালিক শব্দ। অথচ নিরবচ্ছিন্নভাবে মাটির নিচ থেকে উঠে আসছে স্বচ্ছ পানির ধারা, প্লাবিত করছে তৃষ্ণার্ত ফসলের মাঠ।
রাজশাহী বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির সংকট কাটাতে এবার কাণ্ডারি হয়ে উঠেছে দূর আকাশের সূর্য। সৌরশক্তিচালিত সেচ পাম্পের বদৌলতে খরার ভূমিতে এখন শুরু হয়েছে ফসলের নতুন বিপ্লব।
একসময়ের অনাবাদি ও খরাকবলিত জমিতে এখন শোভা পাচ্ছে ধান, বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মরিচ। পানির সংযোগ পাওয়ায় বহু জমিতে বছরে তিনবারও ধানের আবাদ করছেন কৃষকরা। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার ফসলের মাঠে গিয়ে দেখা যায় এই অভাবনীয় পরিবর্তনের ছবি।
স্থানীয় কৃষক আনারুল জানান, আগে পানির জন্য তাদের চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে হতো। দূরের পুকুর থেকে ডিজেলের পাম্প চালিয়ে পাইপে পানি আনতে যে খরচ হতো, তাতে লাভের মুখ দেখা ছিল দায়। পল্লী বিদ্যুতের লাইন মিলত না। এখন সে চিত্র বদলে গেছে। রোদ উঠলেই পাম্প চলে, উঠে আসে পানি। সম্পূর্ণ বিনা জ্বালানি খরচে এখন ২০ জন কৃষকের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বিঘা জমি অনায়াসে সেচ পাচ্ছে।
একক মালিকানায় নয়, ২০ জন স্থানীয় কৃষকের যৌথ কমিটি এই সৌর পাম্প পরিচালনা করছে। সুমন নামের আরেক কৃষক জানান, আগে তারা শুধু আমন ধান আর শীতকালীন সবজি বা ডালের ওপর নির্ভর করতেন। পানি সহজলভ্য হওয়ায় এখন আউশ ও বোরো ধানের পাশাপাশি আগাম জাতের সবজি চাষ করে তারা বাড়তি মুনাফা করছেন।
পাশের ক্ষেতে বেগুন তোলার ব্যস্ততার মাঝেই কৃষক আক্তার হোসেন বলেন, পানি পাওয়ার পর এই অনাবাদি আর মৃতপ্রায় জমিগুলো এখন আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। পলিথিন দিয়ে মালচিং পদ্ধতিতে আগাম ফুলকপির চারা তৈরিতেও মন দিয়েছেন তিনি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় এই বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে সৌরভিত্তিক সেচ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপগুলোর কার্যক্ষমতা দিনে দিনে কমছিল। সেই সংকট কাটাতে কৃষকদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সৌর সেচব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প সূত্র জানায়, গত দুই বছরে রাজশাহী বিভাগে ৩২টি সৌর সেচ পাম্প বসানো হয়েছে। এর মধ্যে নির্দিষ্ট জমিতে সেচের জন্য রয়েছে ২৪টি ‘ফিক্সড সোলার ইরিগেশন’ (প্রতিটির ক্ষমতা ২ এইচপি)। সুবিধামতো এক জমি থেকে অন্য জমিতে নেয়ার জন্য দেওয়া হয়েছে ৮টি পোর্টেবল ব্যবস্থা এবং ফলবাগানের সুনির্দিষ্ট সেচের জন্য ১০টি ‘প্রিসিশন সোলার’ ব্যবস্থা।
প্রকল্প পরিচালক এস এম হাসানুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানান, এক-একটি সৌর পাম্প বসাতে দরপত্র অনুযায়ী খরচ হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টাকা। ৫৫০ ওয়াটের ৬টি প্যানেল থেকে মোট ৩,২০০ ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এই ২ অশ্বশক্তির পাম্প অনায়াসে ২০ থেকে ২৫ বিঘা জমিতে পানি সরবরাহ করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় যেখানে একটি গভীর নলকূপের কমান্ড এরিয়া ১৫০ বিঘা থেকে কমে ৮০ বিঘায় নেমে এসেছে, সেখানে এই প্রযুক্তি আশীর্বাদ। সৌর সেচের ফলে কৃষকের সেচ খরচ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে এবং ফসলের নিবিড়তা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ভবিষ্যতে বিদ্যমান ডিজেল ও বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পের সঙ্গেও সৌরপ্যানেল যুক্ত করার পরিকল্পনা চলছে বলে জানান তিনি।
মোহনপুরের কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আব্দুল মতিন সাংবাদিকদের বলেন, বিদ্যুৎহীন দুর্গম এলাকায় এটি সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। তবে বাড়তি বা অফ-সিজনের বিদ্যুৎ যদি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ তৈরি করা যায়, তবে এটি আরও অর্থবহ হবে।
বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম জানান, দেশের কৃষিতে সেচ অন্যতম জ্বালানিনির্ভর খাত। ডিজেলের দাম বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদনে। বরেন্দ্রর মাঠে সৌর সেচের এই সাফল্য পুরো দেশের জন্যই অনুকরণীয়। সেচ মৌসুম ছাড়া বাকি সময়ে সোলার প্যানেলের বিদ্যুৎ দ্রুত ‘নেট মিটারিং’-এর মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার নীতিমালা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন এই অর্থনীতিবিদ।
সোনালী/জগদীশ রবিদাস











