জোড়াতালির লাইনে ট্রেনযাত্রা, ঝুঁকিতে রাজশাহী-আব্দুলপুর রুট
অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা, ডাবল লাইনের দাবি:
স্টাফ রিপোর্টার: দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজশাহী-ঈশ্বরদী রেলপথের রাজশাহী-আব্দুলপুর জংশন অংশটি জরাজীর্ণ ও অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। এই ৪৫ কিলোমিটার সিঙ্গেল ব্রডগেজ লাইনের মধ্যে ৩৫ কিলোমিটার অংশই বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্ঘটনা এড়াতে এ রুটে ট্রেনের স্বাভাবিক গতিসীমা ৯৫ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৪০ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে প্রতিদিনই নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বিলম্বে ট্রেন চলাচল করছে এবং তৈরি হচ্ছে মারাত্মক সিডিউল বিপর্যয়।
দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংস্কার না হওয়া ব্রিটিশ আমলের এই পুরোনো রেললাইনে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। সম্প্রতি আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে ভ্রমণরত হাজারো যাত্রীর মনে তৈরি হয়েছে চরম শঙ্কা ও ভোগান্তি।
সচেতন যাত্রী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত নতুন প্রকল্পের কথা বলা হলেও জরাজীর্ণ এই লাইনের স্থায়ী সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। কোথাও লাইন ভেঙে গেলে কেবল জোড়াতালি দিয়ে সাময়িকভাবে ট্রেন চালানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, গত দুই-তিন বছরে স্থানীয় বাসিন্দা ও সতর্ক ট্রেন চালকদের সময়োপযোগী পদক্ষেপে একাধিক বড় ধরনের ট্র্যাজেডি এড়ানো গেছে। ২০২৫ সালে পঞ্চগড়গামী ‘বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস’ ছেড়ে যাওয়ার পর সরদহ রোড স্টেশনের কাছে রেললাইনের দুই ফুট অংশ ভেঙে যায়।
পরে স্থানীয় গ্রামবাসী লাল কাপড় ও আলো দেখিয়ে খুলনা থেকে আসা ‘সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস’ থামিয়ে দিলে প্রায় ৭০০ যাত্রী প্রাণে বাঁচেন। একইভাবে লোকমানপুর, সরদহ, আড়ানী রেলব্রিজ ও অন্যান্য স্থানে লাইন ভাঙা দেখে কৃষকদের লাল গামছা উড়ানো এবং অস্থায়ী গেটকিপারের তৎপরতায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’, ‘বরেন্দ্র এক্সপ্রেস’ ও ‘কমিউটার এক্সপ্রেস’-এর মতো ট্রেনগুলোতে হাজার হাজার যাত্রী বড় ধরণের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আড়ানী থেকে সরদহ রোড ও নন্দনগাছী হয়ে রাজশাহী পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার অংশের কাঠ ও ক্লিপের অবস্থা অত্যন্ত জরাজীর্ণ। রোদ-বৃষ্টিতে বহু কাঠের স্লিপার নষ্ট হয়েছে, পাশাপাশি লাইনে পর্যাপ্ত পাথরের চরম ঘাটতি রয়েছে। ১৯৬২ সালে শেষবার এই লাইনে বড় ধরণের সংস্কার কাজ করা হয়েছিল। ২০০০ সালের দিকে এ রুটে ডাবল লাইনের প্রকল্প নেওয়া হলেও দুই দশকে তার কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি; প্রকল্পটি আজও কেবল সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়েই আটকে রয়েছে।
পাকশী বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) হাসিনা খাতুন জানান, সপ্তাহে একদিন বিরতি ছাড়া এই রুটে বর্তমানে ১৩ জোড়া আন্তঃনগর, ৪ জোড়া মেইল এবং ৩ জোড়া লোকাল ট্রেন প্রতিদিন চলাচল করে। দীর্ঘদিনের পুরোনো এই লাইনটিতে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে দ্রুত সংস্কার জরুরি।
পাকশী বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ নাজিব কায়সার এবং সহকারী প্রকৌশলী (এইএন) বাবুল হোসেন জানান, আয়ুষ্কাল ৫০ বছর পার হওয়ায় নতুন লাইন স্থাপন এখন সময়ের দাবি। তবে আপাতত রেলকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক রেখে সাময়িক মেরামতের মাধ্যমে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখা হচ্ছে। পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) আবু হেনা মোস্তফা জানান, ঈদকে সামনে রেখে যাত্রীদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে জোর দেওয়া হচ্ছে এবং দ্রুতই সংস্কার কাজ শুরু হবে।
ডুয়েল গেজ ও ডাবল লাইনের জোরালো দাবি:
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিচারে রাজশাহী-আব্দুলপুর রেলপথকে দ্রুত ডুয়েল গেজে উন্নীতকরণ ও ডাবল লাইন বাস্তবায়নের দাবি এখন উত্তরাঞ্চলজুড়ে তুঙ্গে। রাজশাহী অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আম, ধান, আলু, টমেটো, ফুলকপিসহ বিভিন্ন পচনশীল কৃষিপণ্য সারা দেশে পরিবাহিত হয়। কিন্তু রেলের মন্থর গতি ও সিডিউল বিপর্যয়ের কারণে সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পেরে চরম লোকসানের মুখে পড়ছেন কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এ রুটে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন চালুর পাশাপাশি রেফ্রিজারেটেড ও আধুনিক মালবাহী ওয়াগন যুক্ত করা গেলে কৃষিপণ্য দ্রুত সারাদেশে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে কৃষক যেমন ন্যায্য মূল্য পাবেন, তেমনি রাজশাহীকে ঘিরে তৈরি হবে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, হিমাগার ও লজিস্টিকস খাতের বড় বাজার। দ্রুত ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হলে রাজশাহী অঞ্চল একটি প্রধান আঞ্চলিক বাণিজ্যিক হাবে পরিণত হবে, যা উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
সোনালী/জগদীশ রবিদাস











