ঢাকা | অগাস্ট ৩০, ২০২৬ - ১২:২৯ পূর্বাহ্ন

চাঁপাইয়ে নদীতে ডুবে মৃত্যুর মিছিল থামছে না, নেই প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী

  • আপডেট: Saturday, August 29, 2026 - 10:35 pm

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যুরো: মরা পদ্মার পানিতে গোসল করতে নেমেছিল পাঁচ বান্ধবী। হঠাৎ একজন পানিতে ডুবে গেলে তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যায় অন্যরা। একে একে পানিতে তলিয়ে যায় পাঁচ শিশুই। গত শুক্রবার দুপুরের এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দেবিনগর ইউনিয়নের চর চাকলা গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে গ্রামের বাতাস। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ এলাকায় প্রতিবছরই পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু ঘটলেও প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেই।

শুধু চর চাকলা নয়, নদীবেষ্টিত চাঁপাইনবাবগঞ্জে পানিতে ডুবে মৃত্যু যেন দীর্ঘদিনের এক নীরব বাস্তবতা। পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা ও পুনর্ভবা নদীতে গোসল, মাছ ধরা, নৌকায় পারাপার কিংবা চরে খেলতে গিয়ে শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। কিন্তু এসব মৃত্যুর সমন্বিত কোনো তথ্যভাণ্ডার নেই। থানার অপমৃত্যু মামলা, হাসপাতালের রেকর্ড ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্য আলাদাভাবে সংরক্ষিত হওয়ায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করাও কঠিন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখার হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ জনে। অন্যদিকে, জেলার পাঁচ থানার নথিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় ৭০টি অপমৃত্যু মামলা হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ৪৮টি। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, ২০২২ সাল থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত পানিতে ডুবে আহত ও নিহতের সংখ্যা ৬১ জন; এর মধ্যে ১৮ বছরের নিচে ২২ জন এবং ১৮ বছরের বেশি ৩৯ জন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় পদ্মার জলপথ ৩৫ কিলোমিটার, মহানন্দা ৯৬, পাগলা ৩৯ এবং পুনর্ভবা ১৪ দশমিক ১২ কিলোমিটার। অথচ এসব নদীর অধিকাংশ ঘাটেই নেই সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, লাইফ বয়া, লাইফ জ্যাকেট বা জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম। কোথায় গভীর খাদ, তীব্র স্রোত কিংবা ঘূর্ণিপাক-সেটিও জানার সুযোগ নেই সাধারণ মানুষের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতায়ও রয়েছে বড় ঘাটতি। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলকে রাজশাহী থেকে আসতে হয়। ফলে দুর্গম চরাঞ্চলে পৌঁছাতে সময় লাগে, আর ততক্ষণে অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যায় মূল্যবান সময়।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পাউবো ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঘাট চিহ্নিত করে সাইনবোর্ড, লাল পতাকা, লাইফ বয়া ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে এ ধরনের উদ্যোগ এখনো নেয়া হয়নি।

জেলা নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মুনিরের অভিযোগ, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী ও কার্যকর সচেতনতামূলক কর্মসূচির অভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।

জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী বলেন, নদীতে ডুবে মৃত্যু কমাতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখতে হবে।

চর চাকলার পাঁচ শিশুর একসঙ্গে চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের শোক নয়-এটি নদীবেষ্টিত জনপদে নিরাপত্তাহীনতারও নির্মম চিত্র। পাঁচটি প্রাণ হারানোর পরও যদি ঝুঁকিপূর্ণ ঘাট চিহ্নিত, সতর্কতা ব্যবস্থা, স্থানীয় উদ্ধারকর্মী তৈরি ও শিশুদের সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামীতে আরও কোনো গ্রামে যেন একইভাবে মায়ের বুক খালি না হয়-সেই দায় কার, প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের।