ঢাকা | অগাস্ট ২৮, ২০২৬ - ১২:২৮ পূর্বাহ্ন

রাবিতে দুই বিভাগের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ভাঙচুর, আইসিইউতে শিক্ষার্থী

  • আপডেট: Thursday, August 27, 2026 - 10:42 pm

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) টিএসসিতে একটি অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে বাগবিতণ্ডার জেরে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ ও রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ,ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং একাডেমিক ভবনে ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

গত মঙ্গলবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আবদুল লতিফ হলের পেছনে এবং দুই বিভাগের একাডেমিক ভবনে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। এতে রসায়ন বিভাগের অন্তত পাঁচজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়েছে। এদিকে এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে এক সাংবাদিককে মারধর ও হেনস্তার লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে, গত মঙ্গলবার রাতে টিএসসিসিতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ ও রসায়ন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। সেখানে প্রাথমিক বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও তা সমাধান হয়নি। পরবর্তীতে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের কিছু শিক্ষার্থী নবাব আবদুল লতিফ হলের পেছনে রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও মারধর চালায়। এতে রসায়ন বিভাগের দুই শিক্ষার্থী আহত হন। এই ঘটনার জেরে রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হয়ে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের একাডেমিক ভবন ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবনে’ হামলা ও ভাঙচুর চালায়।

এ সময় ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থেকে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীরা পাল্টা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে রসায়ন বিভাগের আরও দুই শিক্ষার্থী আহত হন। পরে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীরা পাল্টা ধাওয়া দিয়ে রসায়ন বিভাগের একাডেমিক ভবন ‘জাবির ইবনে হাইয়ান ভবনে’ হামলা ও ভাঙচুর চালায়। রাবি মেডিকেলের কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, ঘটনার পরপরই মারাত্মক আহত অবস্থায় ফেরদৌস হাসান, সাজিদুর, নোমান ও সামিনকে মেডিকেল সেন্টারে আনা হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে গুরুতর আহত ফেরদৌস হাসান ও সাজিদুরকে দ্রুততার সঙ্গে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম জানান, সংঘাত শুরুর পর থেকেই প্রক্টরিয়াল টিম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়।

তদন্ত কমিটির ঘটনাস্থল পরিদর্শন, রোববারের মধ্যে রিপোর্ট পেশের নির্দেশ: উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলিম তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। দর্শন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম এবং আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক সাহাল উদ্দিনকে সদস্য করে গঠিত এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে অধ্যাপক সাইফুল ইসলামকে।

তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নির্দেশের আলোকেই গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তাঁরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবন ও জাবির ইবনে হাইয়ান ভবনের ভাঙচুর হওয়া দরজা-জানালা এবং অন্যান্য স্থাপনা ঘুরে দেখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেন।

তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে তুচ্ছ ঘটনার জেরে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত। সংঘর্ষে রসায়ন বিভাগের পাঁচজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে একজন বর্তমানে হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আমরা ঘটনাস্থলের আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি দুই বিভাগের উপস্থিত শিক্ষার্থী, সহকারী প্রক্টর ও প্রক্টরের সঙ্গে কথা বলব। তদন্তে ঘটনার পেছনে যাদের সম্পৃক্ততা ও দোষ প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হবে। আশা করছি আগামী রোববার নাগাদ প্রতিবেদন জমা দিতে পারব।

সাংবাদিককে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ: এদিকে সংঘাত চলাকালে সংবাদ সংগ্রহের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আতিকুর রহমান নামে এক শিক্ষার্থী সাংবাদিকের ওপর হামলা, মারধর এবং তাঁর মোবাইল ফোন থেকে ধারণকৃত ভিডিও মুছে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী আতিকুর রহমান গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটির কার্যনির্বাহী সদস্য এবং জাতীয় দৈনিক ‘বাংলা ট্রিবিউন’-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন আতিকুর রহমান। অভিযোগে তিনি জানান, গত বুধবার রাত ১০টার দিকে রবীন্দ্র ভবনের দিকে লাঠিসোঁটা হাতে শিক্ষার্থীদের যাওয়ার ভিডিও ধারণ করার সময় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁকে ঘেরাও করে ভয়ভীতি দেখায় এবং জোরপূর্বক মোবাইল থেকে ভিডিও মুছে ফেলে মারধর করে। আতিকুর রহমান তাঁর অভিযোগে ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের স্বাধীন ও নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিতকরণসহ যুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি জানান।

প্রক্টরের পক্ষে অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করে সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন আহমেদ জানান, গঠিত তদন্ত কমিটি পুরো ঘটনার পাশাপাশি সাংবাদিক লাঞ্ছিত হওয়ার বিষয়টিও পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য হিসেবে যুক্ত করে খতিয়ে দেখবে এবং তদন্তে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিধি অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।