রাজশাহীতে ৫৪৯ কোটি টাকার পাট বিক্রির বিপুল সম্ভাবনা
স্টাফ রিপোর্টার: মৌসুমের শুরু থেকেই অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যার কারণে রাজশাহী জেলাজুড়ে এবার সোনালি আঁশ পাটের আশাতীত বাম্পার ফলন হয়েছে। শুধু যে ফলন ভালো হয়েছে তা নয়, বরং বর্তমান বাজারে পাটের চড়া দাম এবং রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন গ্রামীণ জনপদের চাষিদের মুখে চওড়া হাসি ফুটিয়েছে।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় বাজার সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার উৎপাদিত পাট বিক্রি করে প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকা আয় হওয়ার এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক লেনদেন পুরো অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বড় ধরণের ইতিবাচক হাওয়া বইয়ে দিচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলার ৯টি উপজেলাতেই কমবেশি পাটের আবাদ হয়েছে। জেলায় এবার মোট ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করা হয়েছে, যেখানে এই জমি থেকে ৪৯ হাজার টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল কৃষি বিভাগ।
বিগত বছরের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৫ সালে জেলার ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল এবং মোট উৎপাদন এসেছিল ৪৮ হাজার ৬৭৭ টন। তুলনামূলক বিশ্লেষণে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, গতবারের তুলনায় এবার আবাদি জমির পরিমাণের পাশাপাশি সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধির স্পষ্ট সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে করে পাট চাষের মাধ্যমে অর্জিত আয় কৃষকের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।
মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, চলতি মৌসুমে পাট কাটা, নদী বা জলাশয়ে জাগ দেওয়া এবং আঁশ ছাড়ানোর কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। কৃষি বিভাগের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইতোমধ্যে জেলার মোট আবাদি জমির প্রায় ৮২ শতাংশের পাট সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পন্ন হয়েছে। সংগৃহীত এই জমি থেকেই ইতোমধ্যে উৎপাদিত হয়েছে ৪৮ হাজার ২০০ টন পাট। কৃষি কর্মকর্তাদের আশা, বাকী ১৮ শতাংশ জমির পাট কাটা ও আঁশ ছাড়ানো শেষ হলে মোট উৎপাদনের পরিমাণ পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকে সহজেই অতিক্রম করে যাবে।
গত কয়েক বছরের বাজার দর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ বছর পাটের বাজারমূল্য কৃষকদের জন্য বেশ সন্তোষজনক। বর্তমানে রাজশাহীর স্থানীয় হাটে-বাজারে প্রতি মণ অর্থাৎ ৪০ কেজি পাট বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকা দরে। জেলা কৃষি বিভাগের হিসাব বলছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহীর মোট প্রত্যাশিত পাট বিক্রি করে প্রায় ৫৪৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা ঘরে তুলবেন চাষিরা।
মাঠের বাস্তব অভিজ্ঞতা জানিয়ে বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম এলাকার পাটচাষি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গতবার পাটের উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় চাষিদের মনে কিছুটা হতাশা ও শঙ্কা জমিয়েছিল। তবে সৃষ্টিকর্তার কৃপায় এবার ফলন যেমন মনের মতো হয়েছে, তেমনি বাজারে দামও মিলছে চমৎকার। বর্তমানে প্রতি মণ পাট ৪ হাজার টাকার ওপর বিক্রি করতে পারায় উৎপাদন খরচ উঠিয়ে হাতে ভালো টাকার লাভ থাকছে।
মোহনপুর উপজেলার কৃষক আব্দুল মতিন জানান, সময়মতো পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাট জাগ দেওয়া ও ধোয়ার ক্ষেত্রে এবার বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি। বাজারদর ভালো থাকায় পরিবারের আনুষঙ্গিক খরচ মিটিয়ে এবার কিছু টাকা সঞ্চয় করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
এদিকে পবা উপজেলার কৃষক রবিউল ইসলাম চার বিঘা জমিতে আগাম জাতের পাট চাষ করে ভালো লাভের মুখ দেখছেন। তবে ভালো ফলনের আনন্দের মাঝেও তিনি জানান, শ্রমিকের অতিরিক্ত মজুরি এবং পাট জাগ দেয়ার মতো পর্যাপ্ত পানির সংকট এখনো চাষিদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাগমারা উপজেলার সাইদুর রহমান এবং চারঘাটের কৃষক হৃদয়ও একই আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বাজারে যদি বর্তমান দর বহাল থাকে তবে আগামী বছর এই অঞ্চলে পাট চাষের পরিধি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। রাজশাহীতে উৎপাদিত এই সোনালি আঁশ কেবল স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর এসব উন্নতমানের পাট সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের বড় বড় পাটজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রক্রিয়াজাত পাট পণ্যের চাহিদা বাড়ায় এখান থেকে সংগৃহীত পাটের একটি অংশ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে, যা জাতীয় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিশেষ অবদান রাখছে।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মিতা সরকার গণমাধ্যমকে জানান, জেলাজুড়ে পাট চাষিদের সরকারি প্রণোদনা প্রদান, সময়মতো উন্নত মানের বীজ ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করার কারণে উৎপাদন ও জমির পরিমাণ দুটোই বেড়েছে। তিনি জানান, প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ৩০০ টাকা হারে হিসাব করলেও এ বছর জেলায় প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকা বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক নাদিম আক্তার বলেন, চলতি বছর জেলায় ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল পাট উৎপাদনের আশাবাদ রয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় ২১ হাজার কুইন্টাল বেশি। বাজারে বর্তমানে ক্ষেত্রবিশেষে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মণ বিক্রি হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম মনে করেন, রাজশাহীতে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজারে ভালো মূল্য পাওয়া গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দারুণ বার্তা দিচ্ছে। প্রায় ৫৪৯ কোটি টাকার এই অর্থনৈতিক লেনদেন স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়াবে। তবে কৃষকের এই সুফল পুরোপুরি নিশ্চিত করতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো এবং সরকারি পর্যায়ে সরাসরি বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি জোর দেন।











