ঢাকা | জুন ১২, ২০২৬ - ১২:৪৭ পূর্বাহ্ন

তানোরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ভেঙে পাকা ঘর বরাদ্দে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

  • আপডেট: Thursday, June 11, 2026 - 9:42 pm

তানোর প্রতিনিধি: রাজশাহীর তানোরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের পুরোনো ৫০টি টিনের ঘর ভেঙে নতুন পাকা ঘর বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। আগের টিনের ঘরের বৈধ লিজধারী প্রকৃত ভূমিহীনদের বড় অংশকে বাদ দিয়ে সমিতির সভাপতির প্রায় ২০ জন আত্মীয়-স্বজনকে নতুন ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। ঘটনাটি ঘটেছে তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউনিয়নের ভাণ্ডাইল আশ্রয়ণ গুচ্ছগ্রামে। এই নিয়ে স্থানীয় ভুক্তভোগী ও প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে চরম অসন্তোষ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।

সরেজমিনে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ভাণ্ডাইল মৌজার ৮০ নম্বর দাগে ৪ দশমিক ১১ একর আয়তনের একটি পুকুর পাড়ের ৮১ নম্বর দাগে প্রায় ৩৮ বিঘা সরকারি খাস সম্পত্তিতে ২০০৭ সালে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় টিনের বেড়া দিয়ে ৫০টি ঘর তৈরি করে স্থানীয় ভূমিহীনদের দলিলমূলে বরাদ্দ দেয়া হয়। ঘর পাওয়ার পর স্থানীয় ৫০টি দরিদ্র পরিবার সমিতি গঠনের মাধ্যমে সেখানে বসবাসের পাশাপাশি পুকুরটি জীবিকার উৎস হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালে ওই ৫০টি টিনের ঘর ভেঙে সেখানে ৪৩টি পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে ৩৯টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হলেও ৪টি ঘর এখনও খালি পড়ে আছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন দলিলমূলে টিনের ঘরে বসবাস করার পরও পাকা ঘর বরাদ্দের সময় তাদের বেশির ভাগকে বাদ দিয়ে নতুন তালিকা করা হয়েছে। নতুন তালিকায় সিংহভাগ ঘর পেয়েছেন আশ্রয়ণ প্রকল্প সমিতির সভাপতি আতিকুল ইসলামের আত্মীয়-স্বজন। টিনের ঘরে প্রায় ১৫ বছর ধরে বসবাস করেও পাকা ঘর না পাওয়া মৃত শমসের আলীর স্ত্রী সোনাভান (৫৫) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি আতিকুল ইসলামের নিজের বাড়ি থাকার পরও তার স্ত্রী, ছেলে হৃদয়, দুই ভাই শফিকুল ও জহুরুল ইসলাম এবং শ্যালক, সমন্ধী, মামাতো-খালাতো ভাইসহ প্রায় ২০ জন আত্মীয়ের নামে পাকা ঘর বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। অথচ আমাকে ঘর দেওয়া হয়নি। পুরোনো ঘর ভেঙে দেওয়ায় এখন অন্যের জমিতে (কবরস্থানে) অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘর বানিয়ে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।

অনুরূপ অভিযোগ করে মৃত জিল্লুর রহমানের স্ত্রী মরিজান বেওয়া বলেন, আমার নামে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের রেজিস্ট্রি দলিল থাকা সত্ত্বেও আমাকে পাকা ঘর দেওয়া হয়নি। অতি কষ্টে ঝুপড়িতে থাকছি। তিনি আরও জানান, আক্তার আলীর ছেলে শাকিল আলী, জামিলুরের ছেলে সারোয়ার এবং মৃত রহমানের ছেলে সেকেন্দার আলীর নাম তালিকায় থাকলেও তাদের কোনো ঘর দেয়া হয়নি। অন্যদিকে পারুলের বিয়ে হয়ে উচাডাঙায় চলে যাওয়ার পরও তার নামে ঘর বরাদ্দ রয়েছে। এছাড়া রাকিব ও তার মেয়ে রুনা এবং আকতার বানুর নামে ঘর থাকলেও সেসব ঘরে কেউ থাকে না। একইভাবে পাকা ঘর না পেয়ে রাস্তার ধারে ঝুপড়ি ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানান মেছের আলী নামের আরেক ভুক্তভোগী।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের দাবি, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৪ দশমিক ১১ একরের বিশাল পুকুরটি একক নিয়ন্ত্রণে রাখতেই আতিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে সভাপতি পদ আঁকড়ে আছেন। ওই পুকুর থেকে বছরে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় সম্ভব। আতিকুল পুকুরটি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে বাসিন্দাদের নামমাত্র সুবিধা দেন। পুকুরের আয়-ব্যয়ের হিসাব চাওয়ায় পুরোনো অনেক বাসিন্দাকে বাদ দিয়ে সভাপতির আত্মীয়-স্বজনদের নামে নতুন ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়ম নিয়ে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সুরাহা মেলেনি বলে অভিযোগ তাদের। ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্রদের মাঝে পাকা ঘর বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সমিতির সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, আমার বাড়ি আছে সত্যি, তবে সেটা সরকারি খাস জায়গায়। সরকার যদি কখনো সেই বাড়ি ভেঙে দেয়, তখন কোথায় যাব? তাই পাকা ঘর নিয়েছি। তবে ওই পাকা ঘরে থাকার পাশাপাশি নিজ বাড়িতেও থাকি। আত্মীয়-স্বজনদের বেশি ঘর পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের শুরু থেকেই আমি সমিতির সভাপতি রয়েছি। আমি শুধু নামের তালিকা দিয়েছি, বরাদ্দ দিয়েছে প্রশাসন। এখানে আমার কিছু করার নেই।

এ ব্যাপারে তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নাঈমা খান বলেন, যাদের পূর্বের ঘরসহ ৯৯ বছরের লিজ দেওয়া থাকে, নিয়ম অনুযায়ী নতুন পাকা ঘর তাদেরই পাওয়ার কথা। যাদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাদের বের করে দেওয়া বেআইনি হবে। তবে যদি কোনো প্রকৃত গৃহহীন বাদ পড়ে থাকেন, তারা নতুন বরাদ্দের জন্য আবেদন করতে পারেন। পুরো বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।