ঢাকা | নভেম্বর ৬, ২০২৬ - ১:০২ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

সার পাচার ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে: কৃষিমন্ত্রী

  • আপডেট: Thursday, November 5, 2026 - 9:53 pm

স্টাফ রিপোর্টার: দেশে ইউরিয়া সারের কোনো সংকট নেই উল্লেখ করে কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশের খুবই সীমিত কিছু এলাকায় সারের সাময়িক চাহিদা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে, যেখানে সীমান্তের ওপারেও চাষাবাদ হয়, সেখানে এই সংকট সৃষ্টির আশঙ্কায় সার পাচার ঠেকাতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিকে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আম ও লিচুবাগান, আধুনিক পদ্ধতিতে আদা উৎপাদন এলাকা এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) বিভিন্ন কৃষি ও সেচ প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শনকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিন দিনের সরকারি সফরে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে এসে তিনি দুই জেলার বিভিন্ন কৃষি উৎপাদন, সম্ভাবনাময় ফসল ও মাঠপর্যায়ের কৃষি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশে ইউরিয়া সারের স্বাভাবিক চাহিদা বছরে প্রায় ২৫ থেকে ২৭ লাখ টন এবং এর বিপরীতে সরকারি সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কিছু অসাধু চক্র যাতে সরকারি সার অপচয় বা পাচার করতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। সারের বণ্টন সহজ করতে প্রতিটি ইউনিয়নে অতিরিক্ত ১ জন করে নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে চলতি মাস থেকেই সার বিতরণ শুরু হবে। একই সাথে সারের ডিলার নিয়োগে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তা খতিয়ে দেখে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

বৃহস্পতিবার সকালে মন্ত্রী রাজশাহীর হরিপুর ইউনিয়নের কসবা এলাকায় কৃষক মোহাম্মদ নাজমুল করিম সুজনের লিচুবাগানে বস্তায় আদা চাষের আধুনিক প্রযুক্তি পরিদর্শন করেন। এরপর দুপুর ১২টার দিকে তানোরের মুন্ডুমালা পৌরসভার আইড়া এলাকায় রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও তানোর পৌরসভার সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিজানের আমবাগান ঘুরে দেখেন। সেখানে উত্তম কৃষিচর্চা (জিএপি) অনুসরণ করে বাণিজ্যিক আম চাষের পাশাপাশি সাথি ফসল হিসেবে মাসকলাই চাষের অগ্রগতি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার হোসেনডাঙ্গা ও বাবুডাং এলাকায় গ্রীষ্মকালীন টমেটো এবং বারোমাসি আমবাগান পরিদর্শনে যান মন্ত্রী।

সেখানে কৃষক মোহাম্মদ আলীর আমবাগানে গাছের ছায়ায় আদা চাষ এবং আতিক আলীর গ্রীষ্মকালীন টমেটো ক্ষেত পরিদর্শন শেষে এক সমাবেশে তিনি বলেন, সরকার কৃষকের উৎপাদন বাড়াতে খাল খনন ও ভূ-পৃষ্ঠের পানি ব্যবহারের কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। রাজশাহীর বিভিন্ন কর্মসূচিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুর রহিম, রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান, উপ-পরিচালক মো. মোস্তফা কামাল, বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান এবং তানোর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিব শংকর বসাক উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সমাবেশে জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোঃ মুসা জঙ্গীর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য মোঃ হারুনুর রশিদসহ স্থানীয় কৃষক প্রতিনিধিবৃন্দ।

এদিকে, রাজশাহী বিভাগের আম, লিচু, আদা, কাঁচামরিচ ও টমেটো চাষি এবং কৃষি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজশাহী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মন্ত্রী উপস্থিত থেকে স্থানীয় চাষি ও উদ্যোক্তাদের মতামত শোনেন এবং কৃষির আধুনিকায়ন, পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ ও রপ্তানি সম্প্রসারণে সরকারের নানা রূপরেখা তুলে ধরেন।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ বলেন, কৃষকদের আয় বৃদ্ধি ও আবাদে বহুমুখীকরণ আনতে প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি নতুন ফসল উৎপাদনের দিকে জোর দিতে হবে। বিশেষ করে আমবাগানের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গায় মাটিতে কিংবা বস্তায় আধুনিক উপায়ে আদা চাষ সম্প্রসারণের আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি তুলা চাষের সাথে সাথি ফসল হিসেবে আদা ও হলুদ চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করে মন্ত্রী ঘোষণা দেন যে, প্রকৃত আদা চাষিদের তালিকা তৈরি করে তাদের বীজ, সার ও বস্তাসহ প্রয়োজনীয় সরকারি প্রণোদনা প্রদান করা হবে। কৃষি পণ্যের আমদানিনির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী জানান, গ্রাফটিং প্রযুক্তি ও পলি শেডের মাধ্যমে বর্ষাকালীন টমেটো ও কাঁচামরিচ উৎপাদন বৃদ্ধির বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষকরা যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য পরিকল্পিত উৎপাদন ও সুষ্ঠু বাজারজাতকরণের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন তিনি।

রাজশাহীর বিখ্যাত আমের স্থায়িত্ব ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, পচনশীলতা রোধে আধুনিক বিদেশি প্রযুক্তির সহায়তায় আম প্রাথমিক ধাপে ৪৫ দিন এবং পরবর্তীতে ৯০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ড্রাই ম্যাংগোসহ অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ এবং লিচু সংরক্ষণের মেয়াদ বাড়াতে সরকার সব ধরনের সহায়তা দেবে। এছাড়া সভায় মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভার্মি কম্পোস্ট বা জৈবসারের ব্যবহার বাড়ানো, অনুমোদিত বালাইনাশকের সীমিত প্রয়োগ, সঠিক পরিপক্ব অবস্থায় তুলা সংগ্রহ করা এবং সার বিতরণে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা দেন মন্ত্রী। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) নির্বাহী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম খান এবং রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। সভায় বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন এলাকার সফল কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা অংশ নেন।