ঢাকা | নভেম্বর ২, ২০২৬ - ১০:৫৫ অপরাহ্ন

শিরোনাম

চারঘাটে যমজ দুই বোনের জিপিএ-৫ লাভ উচ্চশিক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পরিবার

  • আপডেট: Monday, November 2, 2026 - 9:36 pm

চারঘাট প্রতিনিধি: একই দিনে জন্ম, একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা। এমনকি আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনার জন্য ভাগাভাগি করে ব্যবহার করেছে একটি বই। সেই সংগ্রাম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির ফলও পেয়েছে একসঙ্গে। এসএসসির পর এবার এইচএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ অর্জন করেছে যমজ দুই বোন আয়েশা আক্তার তোয়া ও খাদিজা আক্তার তানহা। তবে সাফল্যের আনন্দের মাঝেও তাদের পরিবারে এখন একটাই দুশ্চিন্তা অভাবের সংসারে দুই মেয়ের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হবে কীভাবে ?

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার আস্করপুর গ্রামের এই দুই বোনের এমন সাফল্যে আনন্দিত পরিবার ও এলাকাবাসী। তোয়া ও তানহা উপজেলার আস্করপুর গ্রামের তুফান আলী ও সালমা বেগম দম্পতির মেয়ে। সরদহ সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজনই জিপিএ-৫ পেয়েছে। এর আগে এসএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ পেয়েছিল তারা।

তাদের বাবা তুফান আলী পেশায় রডমিস্ত্রি। তিন মেয়ে ও স্বামী-স্ত্রী মিলে পাঁচ সদস্যের সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাড়ির সামান্য ভিটা ছাড়া কোনো জমিজমা নেই। দিনমজুরির আয়েই চলে সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা। এমন বাস্তবতায় যমজ দুই মেয়ের জোড়া জিপিএ-৫ পাওয়া পরিবারটির জন্য বড় প্রাপ্তি।

গত রোববার সরেজমিনে আস্করপুর গ্রামে তোয়া-তানহাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট মাটির বাড়িতে পরিবারের বসবাস। ঘরের অভাব-অনটন আর সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই দুই বোনের স্বপ্ন আকাশছোঁয়া। তাদের ইচ্ছা, একসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেয়া। সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করে একদিন বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করতে চায় তারা।

এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় সারা দেশের মতো রাজশাহীতেও ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে। পাসের হার ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশ। কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও। বিশেষ করে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া ছিল কঠিন। চারঘাট উপজেলায় ক্যাডেট কলেজের বাইরে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১৩ জন। তাদের মধ্যে রয়েছে তোয়া ও তানহা।

আয়েশা আক্তার তোয়া বলে, আমরা দুই বোন একই দিনে জন্মেছি। একই স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করেছি। এসএসসি ও এইচএসসি দুটোতেই জিপিএ-৫ পেয়েছি। আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। দুই বোন একই শ্রেণিতে পড়ায় একটি বই দিয়েই দু’জনের পড়াশোনা হয়েছে। স্কুল ও কলেজের শিক্ষকরাও আমাদের প্রতি আন্তরিক ছিলেন। সব সময় সহযোগিতা করেছেন। এখন আমাদের ইচ্ছা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো কোনো বিষয়ে দুজন একসঙ্গে পড়াশোনা করা।

খাদিজা আক্তার তানহা বলে, আমাদের দুজনের স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেয়া। সরকারি কোনো কলেজে শিক্ষকতা করতে চাই। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও বাবা-মা আমাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন। ভবিষ্যতে তাঁদের মুখ উজ্জ্বল করতে চাই। পাশাপাশি বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়াতে চাই।

দুই মেয়ের সাফল্যে খুশি হলেও সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা ভেবে দুশ্চিন্তায় মা সালমা বেগম। গৃহিণী এই মা বলেন, আমার দুই মেয়ে সব সময় মিলেমিশে পড়াশোনা করে। প্রতিটি শ্রেণিতেই ভালো ফল করেছে। এইচএসসিতে দু’জনই জিপিএ-৫ পাওয়ায় আমরা সবাই খুব খুশি। কিন্তু সংসারে ওদের বাবা ছাড়া আয়ের আর কেউ নেই।

প্রতিদিন যা আয় হয়, তা দিয়ে তিনবেলা খাবারের খরচ চালাতেই শেষ হয়ে যায়। রাজশাহীর বাইরে কোথাও ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পাঠানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। তাই ওরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। জানি না, সামনে পড়াশোনার সব খরচ কীভাবে চালাব।

বাবা তুফান আলী তখন কাজের প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে। মুঠোফোনে তিনি বলেন, বাড়ির সামান্য ভিটা ছাড়া আমাদের কোনো জমি নেই। রডমিস্ত্রির কাজ করে যা আয় করি, তা দিয়েই সংসার ও মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাই। মেয়েরা ভালো ফল করেছে, এতে আমি অনেক খুশি। এখনো বাইরে কাজ করছি, ওদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই এত পরিশ্রম। আমার তিন মেয়ে আমার কাছে তিন রাজকন্যা। ওরা যেন ঠিকমতো পড়াশোনা শেষ করতে পারে, এটাই আমার চাওয়া।

সরদহ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সামসুল হক বলেন, তোয়া ও তানহা শিক্ষার্থী হিসেবে খুবই ভালো। তারা অত্যন্ত নম্র, ভদ্র, ধার্মিক ও বিনয়ী। ইচ্ছাশক্তি থাকলে আর্থিক সংকট যে পড়াশোনার পথে বাধা হতে পারে না, এই দুই বোন তার উদাহরণ। সরকারি পর্যায় থেকেও তাদের পাশে থাকা উচিত। আমরাও সহযোগিতার চেষ্টা করব। তাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।