রাজশাহীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
স্টাফ রিপোর্টার: জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তনের ফলে মশাবাহিত রোগের মারাত্মক ঝুঁকি মোকাবিলায় নিয়মিত কীটতাত্ত্বিক জরিপ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে পরিবেশ ও যুব সংগঠনগুলো।
“তিন দিনে একদিন, জমা পানি ফেলে দিন”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে গতকাল সোমবার বিকেল ৫টায় রাজশাহীর পদ্মা গার্ডেন (বড়কুঠি) এলাকায় ডেঙ্গু ঝুঁকি মোকাবিলায় এক সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়। বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম, সূর্যকিরণ সমাজকল্যাণ সংস্থা এবং গবেষণা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান বারসিক যৌথভাবে এই কর্মসূচির আয়োজন করে।
ক্যাম্পেইনে উপস্থাপিত বৈজ্ঞানিক তথ্যে রাজশাহীর ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০২০-২০২২ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট গবেষক দলের পরিচালনায় পরিচালিত গবেষণায় এডিস মশার দুটি প্রধান প্রজাতি—‘এডিস ইজিপ্টি’ ও ‘এডিস অ্যালবোপিকটাস’-এর ক্ষতিকর উপস্থিতি শনাক্ত হয়।
এছাড়া সম্প্রতি (৩-১০ আগস্ট ২০২৬) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের উদ্যোগে নগরীর কাজিহাটা, চণ্ডীপুর, উপরভদ্রা, নামোভদ্রা ও হাজরাপুকুর এলাকায় পরিচালিত কীটতাত্ত্বিক জরিপে দেখা যায়, ৭৫টি বাড়ির মধ্যে ২৪টিতেই এডিস মশার লার্ভা বিদ্যমান, অর্থাৎ ‘বাড়ি সূচক’ ছিল ৩২ শতাংশ। জরিপকৃত ৬৮টি পানি ধারণকারী পাত্রের মধ্যে ৪৬টিতে লার্ভা পাওয়ায় ‘পাত্র সূচক’ দাঁড়িয়েছে ৬৭.৬৫ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশিকা অনুযায়ী, ‘ব্রেটো সূচক’ ২০-এর বেশি হলেই তা উচ্চ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়; কিন্তু রাজশাহীর বর্তমান সূচক দাঁড়িয়েছে ৬১.৩৩, যা নির্ধারিত বিপজ্জনক সীমার তিন গুণেরও বেশি। জরিপে সংগৃহীত ৬৮৫টি লার্ভার মধ্যে ৫০৫টি এডিস অ্যালবোপিকটাস এবং ৮৬টি এডিস ইজিপ্টি প্রজাতির। ফুলদানি, প্লাস্টিক ও সিরামিকের টব, নারকেলের খোসা, রঙের বালতি ও জলমগ্ন মেঝেতে এসব লার্ভা সবচেয়ে বেশি মিলেছে।
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক পলি রানীর সঞ্চালনায় ক্যাম্পেইনে মূল বক্তব্য তুলে ধরেন সংগঠনের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশের সংকট নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যেরও সংকট। আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা বাড়ায় মশার বংশবিস্তার ও প্রজননচক্র দ্রুততর হচ্ছে। তাই জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে প্রজননস্থল ধ্বংস ও সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে।
আদিবাসী যুব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাবিত্রী হিমব্রম বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধকে কেবল মশা নিধনে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক অংশগ্রহণের সমন্বিত উদ্যোগ হিসেবে দেখতে হবে। লিও ক্লাব অব রাজশাহী মেট্রোপলিটনের সভাপতি রাকিব হাসান প্রতিটি ওয়ার্ডে তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপের জোর দাবি জানান।
ক্যাম্পেইনে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন সামাজিক কল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সম্রাট রায়হান, বারসিকের সহযোগী কর্মসূচি কর্মকর্তা অমিত সরকার, তহুরা খাতুন লিলি এবং নবজাগরণ ফাউন্ডেশনের সদস্য রায়হান। বক্তারা একযোগে জানান—ডেঙ্গু মোকাবিলায় আতঙ্কের বদলে বৈজ্ঞানিক তথ্য, সামাজিক অংশগ্রহণ ও কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।
সোনালী/জগদীশ রবিদাস











