ঢাকা | সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ - ১১:৪৬ অপরাহ্ন

রাজশাহী: সবুজ হারিয়ে ‘পুকুরের নগরী’ এখন মরুর পথে

  • আপডেট: Sunday, September 20, 2026 - 10:36 pm

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী নগরীতে আশঙ্কাজনক হারে কমেছে সবুজ এলাকা ও প্রাকৃতিক জলাধার। গত তিন দশকে নগরীর সবুজ এলাকা প্রায় ২৬ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ ও আবাসন সম্প্রসারণের প্রভাবে এক সময়কার ‘পুকুরের নগরী’ খ্যাত রাজশাহীতে গত এক দশকেই বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় ৮০০ পুকুর।

প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণকারী এসব জলাশয় ও সবুজ আবহে ধস নামায় রাজশাহী শহরের স্থানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সামগ্রিকভাবে দেখা দিচ্ছে মারাত্মক পরিবেশগত ঝুঁকি।

গবেষণা ও স্থানীয় প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালেও রাজশাহী নগরীতে ছোট-বড় প্রায় ৯৫২টি পুকুর টিকে ছিল। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই সংখ্যা বর্তমানে আশঙ্কাজনকভাবে কমে দুই শর কাছাকাছি এসে ঠেকেছে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো নির্মাণ, বহুতল ভবন, মার্কেট ও নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে গিয়ে একের পর এক প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করা হয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, গত তিন দশকে নগরীর সবুজ এলাকা ২৬ শতাংশ কমার বিপরীতে ইটের তৈরি অবকাঠামোর পরিমাণ ৯ দশমিক ৭৩ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে প্রায় ২২ দশমিক ৯৯ বর্গকিলোমিটারে গিয়ে পৌঁছেছে। পুকুর ভরাট বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের অভিযান, জরিমানা ও আইনি বিধিনিষেধ সত্ত্বেও অসাধু চক্রের এমন প্রবণতা থামছে না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোথাও অভিযান চালিয়ে ভরাট কাজ বন্ধ বা উদ্ধার করা হলেও নিয়মিত নজরদারির অভাবে কিছুদিন পর আবারও সেখানে মাটি ফেলা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাতের আঁধারে ট্রাক বা ট্রলিতে করে মাটি এনে জলাধার ভরাট করা হচ্ছে।

আবার কোথাও ময়লা-আবর্জনা ও নির্মাণসামগ্রী ফেলে ধীরে ধীরে জলাধারের গভীরতা কমিয়ে আনা হচ্ছে। নগরীর হড়গ্রাম এলাকার প্রায় দুই বিঘা আয়তনের একটি পুকুরে সম্প্রতি এমনই পুনরায় ভরাটের অভিযোগ উঠেছে। বাণিজ্যিক ও আবাসিক উদ্দেশে এসব জমির আর্থিক মূল্য কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় প্রভাবশালী মহলের কিছু লোক জলাধার ভরাটের ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটছেন। প্রাকৃতিক জলাধার ও উদ্ভিদ কমে যাওয়ার ক্ষতিকর প্রভাব সরাসরি পড়ছে শহরের তাপমাত্রার ওপর।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চন্দন রায় জানান, পুকুর শুধু পানি ধারণের জায়গা নয়, বরং শহরের নিজস্ব তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও বর্ষায় অতিরিক্ত পানির চাপ কমানোর প্রধান মাধ্যম। জলাভূমি ও সবুজ এলাকা কমে যাওয়ার ফলে নগরীতে ‘নগর তাপদ্বীপ’ প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে, যা স্থানভিত্তিক উষ্ণতা অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্য বিশ্লেষণেও এই তাপীয় পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট দেখা যায়। ২০০৫ সালে নগরীতে সর্বোচ্চ ৪২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোতেও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি ওঠানামা করে। ২০০৭ সালে ৪২.০২, ২০১৪ সালে ৪২.৬, ২০২৪ সালে ৪৩ এবং ২০২৬ সালে সর্বোচ্চ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাবের পাশাপাশি নগরীর উপরিভাগে পিচ, ইট ও কংক্রিটের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া এবং সবুজ ছায়া কমে যাওয়া স্থানীয় পরিবেশকে ক্রমেই উত্তপ্ত করে তুলছে।

একই সঙ্গে শহরের কমে যাওয়া পুকুর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার জন্যও বিরাট হুমকি তৈরি করেছে। রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের মতে, নগরীর অনেক বহুতল ভবনে নিজস্ব পানির রিজার্ভ থাকলেও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সময় খোলা পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলোই ফায়ার সার্ভিসের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ভরসা। ফলে এসব পুকুর হারিয়ে যাওয়ায় অগ্নিনির্বাপণে চরম জটিলতা ও বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি-বেলার (ইঊখঅ) তথ্য অনুযায়ী, শুধু রাজশাহী নগরীই নয়, বিভাগের বেশ কিছু নদী ও শতাধিক খাল-বিল দখল ও ভরাটের শিকার হয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে।

বেলার রাজশাহী সমন্বয়কারী তন্ময় কুমার সান্যাল মনে করেন, নদী ও খালের সমন্বিত প্রাকৃত প্রবাহ নষ্ট হওয়ার ফলে রাজশাহীতে বর্ষার পানির পুনর্ভরণ ব্যাহত হচ্ছে এবং গ্রীষ্মে তীব্র গরম ও শীতকালে অতিরিক্ত শীত অনুভূত হচ্ছে। নগরীতে পুকুর ভরাটের পাশাপাশি জেলার গ্রামীণ এলাকায় কৃষিজমি কেটে মাছ চাষের উদ্দেশ্যে অপরিকল্পিত পুকুর খননও নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছ। একই সঙ্গে সড়ক সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে নির্বিচারে গাছ কাটাও পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক নজরদারির বিষয়ে রাজশাহী অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মহিনুল হাসান সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন- কোনো পুকুর ভরাটের খবর পাওয়া মাত্রই স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে। গত দুই বছরে রাজশাহী মহানগরীর কোনো পুকুরের শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমোদন দেওয়া হয়নি এবং অবশিষ্ট জলাধার রক্ষায় এই কঠোর অবস্থান বহাল থাকবে।

রাজশাহী বোয়ালিয়া থানার সহকারী ভূমি কর্মকর্তা রাহাতুল কবির মিজান মনে করেন, অভিযান পরিচালনা ছাড়াও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ডিজিটাল তালিকা তৈরি, স্যাটেলাইট নজরদারি ও ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের ওপর কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পুকুর ও জলাশয় ভরাট করে অসাধু উপায়ে অর্থবিত্তের মালিক হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাজশাহী নগরীকে একটি বাসযোগ্য, আধুনিক ও সুপরিকল্পিত শহর হিসেবে টিকিয়ে রাখতে অবশিষ্ট প্রতিটি জলাধার সংরক্ষণে সকল সংস্থার সমন্বয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সোনালী///জগদীশ রবিদাস