ঢাকা | অগাস্ট ১৫, ২০২৬ - ১২:২৫ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

চারঘাটের গ্রামবাংলার সেই বৈঠকখানা এখন শুধুই স্মৃতি

  • আপডেট: Friday, August 14, 2026 - 10:08 pm

মোজাম্মেল হক, চারঘাট থেকে: একসময় রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার গ্রামবাংলার পরিচিত দৃশ্য ছিল বৈঠকখানা। কারও বাড়ির উঠানে, কারও বা রাস্তার পাশে বাঁশ-খড়ের ছাউনি দেয়া ছোট্ট ঘর। সন্ধ্যা হলেই সেখানে জমত মানুষের আড্ডা।

হাসি-গল্প, সুখ-দুঃখের কথা আর গ্রামের নানা বিষয় নিয়ে চলত প্রাণবন্ত আলোচনা। সেই বৈঠকখানা এখন আর আগের মতো নেই। সময়ের স্রোতে তা যেন হারিয়ে গেছে স্মৃতির পাতায়।

চারঘাটের বিভিন্ন গ্রামের প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো জীবন্ত সেই দিনগুলো। সারাদিনের কাজ শেষে কৃষক, দিনমজুর, ব্যবসায়ী ও গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা বৈঠকখানায় বসতেন। গ্রামের কারও বাড়িতে বিয়ে, কারও অসুস্থতা, ফসলের সমস্যা কিংবা কোনো সামাজিক বিরোধ সবকিছু নিয়েই আলোচনা হতো সেখানে। অনেক সময় বয়োজ্যেষ্ঠদের পরামর্শেই মিলত সমস্যার সমাধান।

কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে গেছে চারঘাটের গ্রামীণ জীবন। মাটির ঘরের জায়গায় উঠেছে পাকা ভবন, হাতে এসেছে স্মার্টফোন, ঘরে ঘরে টেলিভিশন ও ইন্টারনেট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যস্ততায় মুখোমুখি বসে গল্প করার সময়ও কমেছে। ফলে একসময়কার প্রাণবন্ত বৈঠকখানাগুলো আজ পরিণত হয়েছে স্মৃতির অংশে।

চারঘাট উপজেলার সরদহ ইউনিয়নের খোর্দ্দগোবিন্দপুর গ্রামের জামাল আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, এই মাচাংটি আমার কাছে শুধু একটি বসার জায়গা নয়, এটি আমাদের বাপ-দাদার রেখে যাওয়া ঐতিহ্য ও স্মৃতির জীবন্ত নিদর্শন। আমার বাবা-চাচারাও একসময় এই মাচাংয়ে বসতেন, গল্প করতেন এবং গ্রামের নানা বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন।

সময়ের সাথে মাচাংটি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বাপ-দাদার সেই স্মৃতি ও ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য নিজের উদ্যোগে এটি সংস্কার করে আবার ঠিক করেছি। এই মাচাংয়ের প্রতিটি অংশের সঙ্গে আমাদের পরিবারের আবেগ, শৈশবের স্মৃতি ও পুরোনো দিনের গল্প জড়িয়ে আছে। তাই এটিকে যত্ন করে টিকিয়ে রাখা আমার কাছে শুধু দায়িত্ব নয়, এক ধরনের ভালোবাসাও।

চারঘাটের প্রবীণদের সাথে কথা হলে তারা আক্ষেপ করে বলেন, আগে মানুষ মানুষের কাছে বসত, একে অন্যের খোঁজ নিত এবং সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিত। এখন যোগাযোগের মাধ্যম বেড়েছে, কিন্তু সেই আন্তরিক আড্ডা নেই আর আগের মতো।

তাদের মতে, বৈঠকখানা হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ঐতিহ্য। নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানেই না, একটি ছোট্ট বৈঠকখানা কীভাবে পুরো গ্রামের মানুষের সম্পর্ককে এক সুতোয় বেঁধে রাখত। নতুন প্রজন্মের কাছে এই সংস্কৃতির গল্প তুলে ধরা এবং পুরোনো বৈঠকখানার স্মৃতি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে তারা মন্তব্য করেন।